গণঅভ্যুত্থানের হিরো থেকে নির্বাচনে জিরো! ভোটের ময়দানে দিশাহারা জুলাইয়ের 'বিপ্লবী' ছাত্রনেতারা
ঢাকা: গণঅভ্যুত্থানের ডাক দিয়ে রাজপথে প্রবল প্রতাপ দেখিয়েছিলেন তাঁরা। তাঁদের আন্দোলনের জেরেই ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। কিন্তু রাজপথের সেই দাপট আর ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হলো না। সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে সাধারণ মানুষের থেকে চরম প্রত্যাখ্যানের শিকার হলেন জুলাই আন্দোলনের ‘বিপ্লবী’ ছাত্রনেতারা।
ছাত্রদের দ্বারা নবগঠিত রাজনৈতিক দল 'ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি' (NCP) জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচনে অবতীর্ণ হলেও, দেশের সাধারণ মানুষ তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। গত দেড় বছর ধরে সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে থাকা বেশিরভাগ যুবনেতাকেই নির্বাচনে পরাজয়ের তেতো স্বাদ হজম করতে হয়েছে।
শুক্রবার প্রকাশ্যে আসা নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী, সংসদের ২৯৯টি আসনের মধ্যে বেশিরভাগ আসনেই বিপুল জয় পেয়েছে তারেক রহমানের দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী দলের অবস্থান নিম্নরূপ:
- বিএনপি: ২০৯টি আসন
- জামায়াতে ইসলামী: ৬৮টি আসন
- এনসিপি (ছাত্রদের দল): মাত্র ৬টি আসন
এনসিপি-র মাত্র ৬টি আসনে জয়ের এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে, রাজনৈতিক দল হিসেবে তারা চরম ব্যর্থ হয়েছে। দলের প্রথম সারির নেতাদের পরাজয় সেই চিত্রটাই আরও পরিষ্কার করে দেয়:
- সারজিস আলম: ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ এবং এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম পঞ্চগড়-১ আসনে ৮ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। উল্লেখ্য, এই সারজিসই একসময় হিন্দুদেরুঁশিয়ারি দিয়ে ভারতে পাঠানোর মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন।
- নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারি: দলের আরেক শীর্ষ নেতা নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারি ঢাকা-৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। কিন্তু ঢাকার প্রাক্তন মেয়র, মন্ত্রী ও প্রবীণ বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদের কাছে তাঁকে হার মানতে হয়।
- জুবাইরুল হাসান আরিফ: চট্টগ্রামে এনসিপির একমাত্র প্রার্থী ছিলেন জুবাইরুল। চট্টগ্রাম-৮ আসনে তাঁর অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, তিনি প্রদত্ত ভোটের সাড়ে ১২ শতাংশও পাননি। ফলে নিয়ম অনুযায়ী তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
- তাসনিম জারা: জুলাই আন্দোলনের পরিচিত মুখ তাসনিম জারা ব্রিটেনের হাসপাতালে নিজের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু দল জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধায় তিনি আদর্শগত কারণে দলত্যাগ করেন এবং ঢাকা-৯ আসন থেকে নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়েন। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকেও পরাজয় বরণ করতে হয়েছে।
রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, রাজপথের আন্দোলন আর ভোটের রাজনীতির সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিএনপি-র মতো কয়েক দশকের পুরোনো এবং তৃণমূল স্তরে শক্তিশালী সংগঠন থাকা রাজনৈতিক দলের সামনে সদ্য গঠিত এনসিপি সাংগঠনিকভাবে ছিল একেবারেই দুর্বল। এছাড়া, জামায়াতের সঙ্গে তাঁদের জোট বাঁধাটাও অনেক সাধারণ ভোটার ভালোভাবে গ্রহণ করেননি, যা তাসনিম জারার মতো নেত্রীর দলত্যাগের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়েছিল। সব মিলিয়ে, আবেগ দিয়ে যে সরকার পতন সম্ভব, শুধু সেই আবেগ দিয়ে যে নির্বাচনে জয়লাভ সম্ভব নয়—এই নির্বাচনের ফলাফল তারই প্রমাণ দিল।

0 মন্তব্যসমূহ
Thank you so much for your kindness and support. Your generosity means the world to me. 😊