শীতল ষষ্ঠী ও গোটা সেদ্ধ: সরস্বতী পুজোর পর বাঙালির অরন্ধন ও এক হারানো ঐতিহ্যের গল্প
-ড.শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
বিদ্যার দেবীর আরাধনার রেশ কাটতে না কাটতেই বাঙালি মেতে উঠবে চেনা ছকের বাইরে বেরিয়ে এক অন্যরকম খাওয়ায়। তাই এ খাওয়া শুধু পুরনো সময়কে ফিরে পাওয়া - তা নয়, রন্ধনেও শৈলী বদল। সবই গোটা এবং সবই সেদ্ধ - আর তা নিয়েই গোটা সেদ্ধ - সরস্বতী পুজোর পরের দিন বাংলার ঘরে ঘরে শীতল ষষ্ঠী উদযাপন।
এই দিন অধিকাংশ বাড়িতে বন্ধ থাকে রান্নাবান্না - কার্যত অরন্ধন। তাই আগের দিন রাতে প্রস্তুত করা হয় গোটা সেদ্ধ। এতে উপাদান হিসেবে থাকে শীষ সমেত পালং, মুগ, বেগুন, শিম, টোপা কুল - সবই গোটা। সঙ্গে সজনে ফুল আর কড়াইশুটি। না কেটেই সবকিছু একসঙ্গে সেদ্ধ করা হয়। সেদ্ধ হয়ে গেলেই রান্না শেষ। সাধারণভাবে এতে কোনও মসলা দেওয়ার চল নেই। তবে অনেকে মসলা দেন।
সরস্বতী পুজোর পরের দিন সকালে ষষ্ঠী পুজো মূলত বাড়ির স্ত্রীরাই পালন করেন। বাড়ির শীল, নোড়ার পুজো হয় এই ষষ্ঠীতে। অনেক বাড়িতে শীল-নোড়াতে দই দিয়ে ফোঁটা দেওয়ার রেওয়াজ আছে। সেক্ষেত্রে পুজো শেষে সেই দইই গোটা সেদ্ধতে ছিটিয়ে দেওয়া হয়।
তবে অনেক বাড়িতে শীল-নোড়াতে হলুদ এবং সিঁদুর দেওয়ারও চল আছে। আর আছে বাটা হলুদ দিয়ে একটা কাপড়ের টুকরো ভিজিয়ে নিয়ে তা দিয়ে শীল-নোড়া ঢেকে দেওয়া। আমাদের বাড়িতেই এই রীতি আছে।
সাধারণভাবে এই আচারের সঙ্গে কোনও মন্ত্রের সংযুক্তি দেখা যায় না। কারণ এটিকে স্ত্রী আচার হিসেবেই দেখা হয়। তবে আমি আমার ঠাকুমার মুখে শুনেছি - আমার প্রপিতামহ, সিদ্ধ তান্ত্রিক ভোলানাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কিছু মন্ত্র বলতেন। হয় তো কিছু তন্ত্র ক্রিয়া এর সাথে সংযুক্ত ছিল। তবে তার অস্তিত্ব - তাঁর চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায়।
সারা পৃথিবীতে যিনি "The Levitating Saint" - হিসেবে বিখ্যাত, সেই ভাদুড়ী মহাশয় বা পরমহংস মহর্ষি নগেন্দ্রনাথের হাওড়ার পায়রাটুঙির জমিদার পরিবারে আবার একসময় এই গোটা সেদ্ধ নেওয়ার জন্য ভিড় জমাতেন তাঁদের জমিদারির প্রজারা। সেজন্য জমিদারিতে আয়োজন শুরু হতো দিন- সাতেক আগে থেকে। এই বংশেরই সন্তান ছিলেন আমার মায়ের পিতামহ সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। মহর্ষি নগেন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর কাকা। এই সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যেরই কনিষ্ঠ পুত্র, আমার মায়ের ছোটো কাকা - বাংলা শ্যামা সঙ্গীতের জীবন্ত কিংবদন্তি পান্নালাল ভট্টাচার্যের অভিন্ন হৃদয় বন্ধু ছিলেন বাংলা সংগীত জগতের আর এক কিংবদন্তি শিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। আমার মামার বাড়ির গোটা সেদ্ধ খেয়ে তাঁর প্রশংসার কথা আমার মা শিবানী ভট্টাচার্য বন্দ্যোপাধ্যায় আজও বলেন।
এই গোটা সেদ্ধ ঠিক কতো বছর ধরে চলে আসছে - তা বলা কঠিন। তবে অনুমান করতে পারি - এর শিকড় আছে গভীরে। আর সেই সূত্রেই আমি বিশ্বাস করি এই শিকড় জুড়েই আছে বাঙালির আয়ুর্বেদ চর্চা তো বটেই, বাঙালির নিজস্বতাও।
.webp)
0 মন্তব্যসমূহ
Thank you so much for your kindness and support. Your generosity means the world to me. 😊