গণবিক্ষোভে জ্বলছে ইরান: নিহত ২ হাজার, গদি বাঁচাতে ‘দেখা মাত্রই গুলি’র নির্দেশ খামেনেইর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী দেশ ইরান এখন বারুদের স্তূপ। কট্টরপন্থী ইসলামি শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবার আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়েছে। সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লা আলি খামেনেইর মসনদ টালমাটাল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিনি মরিয়া হয়ে ‘দেখা মাত্রই গুলি’র (Shoot on sight) নির্দেশ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের সূত্র এবং ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, চলমান বিক্ষোভে এখনও পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার বিদ্রোহীর মৃত্যু হয়েছে এবং জেলবন্দি করা হয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে।
ইরানে মূল্যবৃদ্ধি, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং শিক্ষার অধিকার খর্ব হওয়ার মতো প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে প্রথমে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামলেও, তা এখন সর্বাত্মক সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। অভিযোগ, বিক্ষোভ দমনে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী নজিরবিহীন হিংস্রতার পথ বেছে নিয়েছে। খামেনেইর নির্দেশে দেশের প্রতিটি নিরাপত্তা শাখাকে কঠোর হাতে বিদ্রোহ দমনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, নিহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বহুগুণ বেশি হতে পারে।
ইরানে জনরোষ নতুন কিছু নয়। ২০০৯ সালের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ ছিল মূলত শহুরে মধ্যবিত্তদের রাজনৈতিক অধিকারের লড়াই। পরবর্তীতে ২০১৭ ও ২০১৯ সালে অর্থনৈতিক কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠী রাস্তায় নেমেছিল। সর্বশেষ ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর নারীদের নেতৃত্বে হিজাব বিরোধী আন্দোলন বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এবারের আন্দোলন চরিত্রগতভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ধর্ম, জাতীয়তাবাদ বা ভয়—কোনো কিছুই আর ক্ষুধার্ত ও ক্ষুব্ধ জনতাকে আটকাতে পারছে না। এবারের বিদ্রোহে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ একজোট হয়ে খামেনেই জমানার অবসানের ডাক দিয়েছে।
ইরানের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ভারতের জন্য বড়সড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের শুল্কযুদ্ধ ও অম্লমধুর সম্পর্ক, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মিত্রতা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরান যদি নিজের জনগণের ওপর এই বর্বরোচিত দমননীতি বন্ধ না করে, তবে আমেরিকা হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হবে। পালটা আগ্রাসী জবাব দিয়েছে তেহরানও।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের বিদেশসচিব বিক্রম মিসরি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দিল্লি আপাতত ‘ধীরে চলো’ নীতিতেই বিশ্বাসী। কোনো তড়িঘড়ি মন্তব্য না করে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে সাউথ ব্লক। তবে ভারতের প্রধান উদ্বেগ ইরানে বসবাসরত প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে। চাবাহার বন্দরের ভবিষ্যৎ এবং তেল বাণিজ্যের ওপর এই অস্থিরতা কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও চিন্তিত ভারত।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের কট্টরপন্থী শাসকরা সম্ভবত তাদের সবচেয়ে বড় অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। রাজপথে রক্ত ঝরছে, আর বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠছে—মধ্যপ্রাচ্যে কি তবে পালাবদল আসন্ন?

0 মন্তব্যসমূহ
Thank you so much for your kindness and support. Your generosity means the world to me. 😊