দীপাবলির এক রাতের আতশবাজি কি তিন দিনের যুদ্ধের সমান? ভারতের উৎসবের পরিবেশগত ও বৈশ্বিক বিশ্লেষণ
ভারতের দীপাবলি উৎসবের আতশবাজি উদযাপন এবার এক অভূতপূর্ব মাত্রায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থা এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ECIU) এবং ভারতের সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড (CPCB)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের দীপাবলির রাতে দেশজুড়ে প্রায় ৬২,০০০ টন বিস্ফোরক পদার্থ পোড়ানো হয়েছে। এই পরিমাণ ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। বিস্ফোরকের এই পরিমাণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় তিন দিনের বোমা হামলার সমান বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI) এবং রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট (RUSI)-এর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিদিন গড়ে ২০,০০০ থেকে ২১,০০০ টন বিস্ফোরক ব্যবহার হয়। সেই হিসেবে দীপাবলির এক রাতের আতশবাজি তিন দিনের যুদ্ধের সমান বারুদ পোড়ায়, যা এক রাতেই যুদ্ধের গড় বারুদ ব্যবহারের প্রায় তিনগুণ। এই তুলনা শুধু পরিমাণগত নয়, বরং উৎসব ও ধ্বংসের মধ্যে সূক্ষ্ম সীমারেখা তুলে ধরার একটি চমকপ্রদ প্রচেষ্টা।
দীপাবলির আতশবাজি ও যুদ্ধক্ষেত্রের বিস্ফোরণের রাসায়নিক গঠনেও রয়েছে বিস্ময়কর মিল। ECIU-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উভয় ক্ষেত্রেই উচ্চ তাপমাত্রা, ধাতব যৌগ এবং বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়। আতশবাজি থেকে উৎপন্ন গড় তাপমাত্রা ১,৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের কামান ও বোমা থেকে বিস্ফোরণ ২,৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা তৈরি করে। দীপাবলির রাতে বায়ুমণ্ডলে প্রায় ৪.২ লক্ষ টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিদিন গড়ে ১.৯ লক্ষ টন নির্গত হয়।
দীপাবলির ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলে গড়ে ৩৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টা স্থায়ী হয়। NEERI-এর তথ্য অনুযায়ী, দিল্লি-এনসিআর, কানপুর এবং জয়পুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গত বছর এই ধোঁয়ার প্রভাব তিন দিন পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছিল। এই ধোঁয়ায় উপস্থিত সূক্ষ্ম কণা যেমন PM 2.5, PM 10, সালফার ডাই অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড বাতাসের আর্দ্রতার সাথে মিশে ধোঁয়াশা তৈরি করে, যা শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দীপাবলির পরে বায়ু মানের সূচক স্বাভাবিক স্তরে ফিরে আসতে কমপক্ষে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে।
দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই, জয়পুরসহ ১২টি প্রধান শহরকে কেন্দ্র করে ECIU জরিপে ৬১,৫০০ থেকে ৬৩,০০০ টনের মধ্যে বিস্ফোরক মজুদ রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে, বৈজ্ঞানিক ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (CSIR) এবং জাতীয় পরিবেশ প্রকৌশল গবেষণা ইনস্টিটিউট (NEERI) তাদের রাসায়নিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই সংখ্যাটি প্রায় ৫৯,০০০ টন বলে অনুমান করেছে। দীপাবলির সময় গড়ে প্রায় ৬২,০০০ টন বারুদ পোড়ানো হয়েছে বলে চূড়ান্তভাবে অনুমান করা হচ্ছে, যা ২০২৫ সালের নভেম্বরে নিশ্চিত করা হবে।
এই প্রথমবারের মতো, একটি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ ভারতের সাংস্কৃতিক উৎসবকে একটি যুদ্ধক্ষেত্রের বারুদের সমতুল্য হিসেবে তুলনা করেছে। এটি আমাদের উৎসব উদযাপনের ধরন এবং তার পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। দীপাবলি যেমন আলো ও আনন্দের উৎসব, তেমনি তার মাত্রাতিরিক্ত আতশবাজি ব্যবহারে সৃষ্টি হয় ধোঁয়া, বিষাক্ততা এবং পরিবেশ বিপর্যয়। উৎসবের আনন্দ যেন ধ্বংসের ছায়া না ডেকে আনে—এই বার্তাই তুলে ধরেছে এই গবেষণা।
Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি তথ্যভিত্তিক এবং গবেষণা সংস্থার অনুমান ও বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে তৈরি। পুনঃপ্রকাশের ক্ষেত্রে উৎস উল্লেখ আবশ্যক।

0 মন্তব্যসমূহ
Thank you so much for your kindness and support. Your generosity means the world to me. 😊