বিশ্বকর্মা হলেন স্বর্গের কারিগর, শিল্পী ও নির্মাতাদের বৈদিক দেবতা। ঋগবেদের ১০ম মণ্ডলে ৮১ এবং ৮২ সূক্তদ্বয়ে বিশ্বকর্মার বিশদ উল্লেখ আছে। ঋগবেদ অনুসারে তিনি সর্বদর্শী এবং সর্বজ্ঞ। তাঁর চক্ষু, মুখমণ্ডল, বাহু ও পদ সবদিকে পরিব্যপ্ত। তিনি বাচস্পতি, মনোজব, বদান্য, কল্যাণকর্মা ও বিধাতা অভিধায় ভূষিত। পরমেশ্বর ভগবানের অনুগ্রহে, ব্রহ্মাপুত্র বিশ্বকর্মাই গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নকশা তৈরি করেন বলে হিন্দু ধর্মে (Hindu Mythology) কথিত আছে।
কবে ও কীভাবে পালিত হয় বিশ্বকর্মা পুজো?
বাংলা পঞ্জিকা (Bengali Calendar) অনুসারে প্রতি বছর ভাদ্রমাসের সংক্রান্তির দিন বিশ্বকর্মার পূজা করা হয়। কলকারখানায় বেশ আড়ম্বরের সঙ্গে এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়। অন্যান্য দেব-দেবীর মতোই মূর্তি গড়ে অথবা ঘটে-পটে বিশ্বকর্মার পুজো করা হয়।
- সূতার-মিস্ত্রিদের মধ্যে এঁর পূজার প্রচলন সর্বাধিক। তবে স্বর্ণকার, কর্মকার এবং দারুশিল্প, স্থাপত্যশিল্প, মৃৎশিল্প প্রভৃতি শিল্পকর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিগণও নিজ নিজ কর্মে দক্ষতা অর্জনের জন্য বিশ্বকর্মার পুজো করে থাকেন।
- সমগ্র ভারতবর্ষে নয়, বিশ্বকর্মা পুজো মূলত পশ্চিমবঙ্গ, অসম, রাজস্থান, উত্তরাখণ্ড (দেরাদুন)-এর কিছু কিছু অঞ্চলে পালিত হয়।
- ভারতবর্ষের বিশ্বকর্মা একটি দলিত সম্প্রদায়ের নাম, বিশ্বকর্মা সেই সম্প্রদায়ের আদিম-সভ্য পুরুষ বলেও বিবেচিত।
পুরাণে দেবশিল্পীর জন্ম ও তাঁর অমর সৃষ্টি
বেদে যিনি মুখ্যতঃ বিশ্বস্রষ্টা, পুরাণে তাঁকে দেখি দেবশিল্পী হিসাবে। তিনি "কর্তা শিল্প সহস্রাণাম" অর্থাৎ তিনি সহস্র শিল্পের অধিকর্তা। বিশ্বকর্মার জন্ম বিষয়ে পুরাণে নানা আখ্যানের অবতারণা করা হয়। কোনো পুরাণ মতে তাঁর জন্ম অষ্টবসুর অন্যতম প্রভাসের ঔরসে দেবগুরু বৃহস্পতির ভগিনী বরবর্ণিনীর গর্ভে। আবার ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে প্রজাপতি ব্রহ্মার নাভিদেশ থেকে বিশ্বকর্মার উৎপত্তি।
মহাভারত অনুযায়ী বিশ্বকর্মা হলেন শিল্পকলার দেবতা। ঈশ্বরের প্রাসাদ, দেবতাদের রথ ও অস্ত্রও তৈরি করেছিলেন তিনি। তাঁর অমর সৃষ্টির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- কুবেরের মহল ও স্বর্গের দেবসভা।
- ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা পুরী।
- পুরীর জগন্নাথ দেবের বিগ্রহ।
- রাবণের স্বর্ণলঙ্কা এবং ভগবান শিবের ধনুক ও ত্রিশূল।
এছাড়া মার্কণ্ডেয় পুরাণে দেখতে পাই, ইনি দেবী দুর্গাকে অভেদ্য কবচ, পরশু ও নানান অস্ত্র প্রদান করেছিলেন।
বিশ্বকর্মার হাতে থাকা দাঁড়িপাল্লার তাৎপর্য কী?
"ওঁ দংশপালঃ মহাবীরঃ সুচিত্রঃ কর্মকারকঃ।
বিশ্বকৃৎ বিশ্বধৃকতঞ্চ বাসনামানো দণ্ডধৃক।।
ওঁ বিশ্বকর্মণে নমঃ।"
বিবরণ অনুযায়ী তাঁর চার বাহু, মাথায় মুকুট, এক হাতে জলের কলস ও বই, অপর হাতে দড়ির ফাঁস এবং একটি যন্ত্র বা হাতুড়ি। হাতুড়ি মূলত শিল্পের সাথে জড়িত থাকার প্রতীক। তবে সবচেয়ে কৌতূহলের বিষয় হলো বিশ্বকর্মার হস্তে থাকা দাঁড়িপাল্লা। এই দাঁড়িপাল্লার দুটি পাল্লা মূলত জ্ঞান ও কর্মের প্রতীক। মহাশিল্পী বিশ্বকর্মা তাঁর সৃষ্টির মধ্যে জ্ঞান এবং কর্ম—উভয়ের নিখুঁত সমতা বজায় রেখেছেন, দাঁড়িপাল্লা তারই বার্তা বহন করে।
তথ্য ঋণঃ উইকিপিডিয়া
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. বিশ্বকর্মার হাতে থাকা দাঁড়িপাল্লা কিসের প্রতীক?
বিশ্বকর্মার হাতের দাঁড়িপাল্লার দুটি পাল্লা মূলত 'জ্ঞান' এবং 'কর্ম'-এর প্রতীক। এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জ্ঞান ও কর্মের সঠিক সমতা বজায় রাখার বার্তা দেয়।
২. বিশ্বকর্মা পুজো কবে পালিত হয়?
বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে প্রতি বছর ভাদ্র মাসের সংক্রান্তির দিন কলকারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিশ্বকর্মা পুজো পালিত হয়।
৩. দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার অমর সৃষ্টিগুলি কী কী?
পুরাণ মতে, কুবেরের মহল, শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকাপুরী, রাবণের স্বর্ণলঙ্কা, শিবের ত্রিশূল এবং জগন্নাথ দেবের বিগ্রহ বিশ্বকর্মারই সৃষ্টি।