সাহিত্য জগতে নক্ষত্রপতন! ৯২ বছর বয়সে প্রয়াত 'চৌরঙ্গী'র স্রষ্টা শংকর, শোকস্তব্ধ বাংলা
নিজস্ব প্রতিবেদন: বাংলা সাহিত্য জগতে নেমে এল গভীর শোকের ছায়া। চিরবিদায় নিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়, যিনি আপামর বাঙালি পাঠকের কাছে 'শংকর' নামেই সর্বাধিক পরিচিত। শুক্রবার দুপুরে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্যের এক সুবর্ণ যুগের অবসান ঘটল।
পারিবারিক ও হাসপাতাল সূত্রে খবর, বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ভুগছিলেন। গত বছরের শেষের দিকে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। সেবার কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও, চলতি ফেব্রুয়ারির গোড়ার দিকে ফের তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। একাধিক শারীরিক সমস্যা নিয়ে দিন পনেরো আগে তাঁকে ফের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন তাঁর শরীরে একটি বড় ধরণের টিউমার ধরা পড়েছিল, তবে বয়সজনিত কারণে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়নি। ধীরে ধীরে তাঁর খাওয়া-দাওয়াও বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে শুক্রবার দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিট নাগাদ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। অত্যন্ত অল্প বয়সে কলম ধরেছিলেন তিনি। ১৯৫৫ সালে তাঁর প্রথম বই 'কত অজানারে' প্রকাশিত হয়, যা তাঁকে বিপুল পরিচিতি এনে দেয়। এরপর একে একে তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে আসে 'চৌরঙ্গী', 'সীমাবদ্ধ', 'জন অরণ্য', 'চরণ ছুঁয়ে যাই', 'ঘরের মধ্যে ঘর'-এর মতো একাধিক কালজয়ী উপন্যাস। তাঁর রচিত তিনটি বই নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছিল। এছাড়া স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়েও তাঁর সুগভীর গবেষণা ও একাধিক গ্রন্থ পাঠক মহলে অত্যন্ত সমাদৃত।
বাংলা সাহিত্যে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশ থেকে বহু সম্মাননা পেয়েছেন। ১৯৯৩ সালে তিনি 'বঙ্কিম পুরস্কার' লাভ করেন। ২০২০ সালে তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ 'সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার'-এ ভূষিত করা হয়। এছাড়া ২০১৬ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি. লিট সম্মানে ভূষিত করে।
বর্ষীয়ান এই সাহিত্যিকের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন, "বাংলার প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণি শংকর মুখোপাধ্যায় (শংকর)-এর প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হল। 'চৌরঙ্গী' থেকে 'কত অজানারে', 'সীমাবদ্ধ' থেকে 'জন অরণ্য'—তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছে। তাঁর লেখনীর আঁচড়ে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের না-বলা কথা। বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর সুগভীর গবেষণা ও গ্রন্থসমূহ আমাদের কাছে অমূল্য সম্পদ। তাঁর প্রয়াণ আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও অগণিত গুণগ্রাহীর প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা জানাই।"
শংকরের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বাংলার পাঠকমহল থেকে শুরু করে সাহিত্য ও বিনোদন জগতের বিশিষ্টজনেরা। শরীরী উপস্থিতিতে তিনি আজ 'কত অজানারে' পাড়ি দিলেও, তাঁর অমর সৃষ্টি চিরকাল বেঁচে থাকবে পাঠকের হৃদয়ে।

0 মন্তব্যসমূহ
Thank you so much for your kindness and support. Your generosity means the world to me. 😊