'এটা তো কেবল ট্রেলার, সিনেমা এখনও বাকি!' বকেয়া ডিএ ও বঞ্চনার প্রতিবাদে রাজপথে শিক্ষক সংগঠন, রাজ্যকে তীব্র আক্রমণ এবিটিএ সম্পাদকের
কলকাতা, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: সুপ্রিম কোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশের পরও বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) মেটাতে রাজ্য সরকারের অনীচ্ছার প্রতিবাদে শনিবার রাজপথে নামল বামপন্থী শিক্ষক সংগঠনগুলি। ১৪ ফেব্রুয়ারি, কলকাতা শহরের রাজা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার থেকে কলেজ স্ট্রিট মোড় পর্যন্ত এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিল সংগঠিত হয়। এবিটিএ (ABTA), এবিপিটিএ (ABPTA), বিটিইএ (BTEA) সহ একাধিক শিক্ষক সংগঠন এই মিছিলে অংশ নিয়ে বকেয়া ডিএ প্রদান সহ ৫ দফা দাবি পেশ করে।
এদিনের মহামিছিলে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন এবিটিএ (ABTA)-র সাধারণ সম্পাদক তথা কোচবিহারের শিক্ষক সুজিত দাস। রাজ্য সরকারকে 'চোরের সরকার' বলে কটাক্ষ করার পাশাপাশি আগামী দিনে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
গতকালকের মিছিলে ABTA, ABPTA, BTEA সহ একাধিক শিক্ষক সংগঠনের উপস্থিতি চোখে পড়ে। মিছিল শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সুজিত দাস একাধিক জ্বলন্ত ইস্যু তুলে ধরেন। সুজিত দাস অভিযোগ করেন, সুপ্রিম কোর্ট আগামী ৬ মার্চের মধ্যে ২৫ শতাংশ বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেও রাজ্য সরকার তা কার্যকর করছে না। উলটে জনগণের ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকা খরচ করে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ২০০৯ এবং ২০১৯ সালের রোপা (ROPA)-র প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
রাজ্যের সাম্প্রতিক বাজেট নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, "ইতিহাসে শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে কম বরাদ্দ এবার করা হয়েছে। মিড-ডে মিলের বরাদ্দও কমেছে।"
পার্শ্বশিক্ষক (Para-teachers), ভোকেশনাল শিক্ষক, এসএসকে (SSK) এবং আইসিডিএস (ICDS) কর্মীদের প্রতি রাজ্য সরকার বঞ্চনা করছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, তাঁদের যে সামান্য সাম্মানিক দেওয়া হয়, তা দিয়ে পাঁচ দিনও সংসার চলে না।
রাজ্য সরকারকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে তিনি বলেন, "ভোট চুরি, টাকা চুরি, চাকরি চুরি—এমন কোনও জায়গা নেই যেখানে এই সরকার চুরি করেনি। অন্য রাজ্যে গেলে লজ্জায় আমাদের মাথা হেঁট হয়ে যায়।" এই পরিস্থিতির বদল ঘটাতে নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি এবং অন্যান্য সংগঠনগুলি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে বলে তিনি জানান। তাঁর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, "আজকের এই মিছিল শুধুমাত্র একটা ট্রেলার, পুরো সিনেমা এখনও বাকি। আগামী দিনে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-কাছারি, আদালত স্তব্ধ করে দেওয়া হবে। অভিভাবকদের নিয়ে আমরা রাস্তায় নামব।"
প্রসঙ্গত, দেশের সর্বোচ্চ আদালত আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে বকেয়া ডিএ-এর অন্তত ২৫ শতাংশ মেটানোর নির্দেশ দিলেও, রাজ্য সরকারের তরফে তা কার্যকর করার কোনো সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ। উল্টে নতুন করে কমিটি গঠন এবং আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনার কথা বলে রাজ্য সরকার পুনরায় রায়ের পুনর্বিবেচনার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে বলে মনে করছেন সরকারি কর্মীরা। এর জেরে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যেই শুক্রবার রাজ্যের মুখ্যসচিব ও অর্থসচিবকে নোটিস পাঠিয়েছেন ডিএ মামলাকারীরা। আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি তাই এবার রাস্তার আন্দোলনেও শামিল হয়েছেন শিক্ষকরা।
বকেয়া ডিএ মেটানোর পাশাপাশি এদিনের মহামিছিল থেকে রাজ্য সরকারের কাছে আরও একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন শিক্ষকরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত সমস্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের 'ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ ক্যাশলেস মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট স্কিম ২০১৪'-এর অন্তর্ভুক্ত করা। একইসঙ্গে, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের ক্ষেত্রে সপ্তম পে কমিশন কার্যকর করা এবং পার্শ্বশিক্ষক সহ শিক্ষার সাথে যুক্ত সকল চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের 'সমকাজে সমবেতন' প্রদানের জোরালো দাবি ওঠে। পরিকাঠামো উন্নয়নের স্বার্থে ২০২৫ সালের বাকি থাকা ৭৫ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের সম্পূর্ণ কম্পোজিট গ্রান্ট অবিলম্বে মেটানোর দাবিও জানান শিক্ষক নেতৃত্ব। অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ে সরকার দাবি না মানলে, আগামী দিনে সমস্ত চক্রান্তের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষিকারা।

0 মন্তব্যসমূহ
Thank you so much for your kindness and support. Your generosity means the world to me. 😊