ব্রাহ্ম আচার্য থেকে সনাতন ধর্মের প্রচারক হলেন মহর্ষি নগেন্দ্রনাথ
![]() |
| মহর্ষি নগেন্দ্রনাথ |
লেখক-সাধন কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
বলুহাটি ব্ৰাহ্মসমাজের আচার্য ছিলেন তিনি। কিন্তু ব্রাহ্মসমাজীদের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে উপবীত ত্যাগের নির্দেশ এলে কাঁধে ঝোলানো উপবীত ত্যাগে কিছুতেই রাজি হলেন না নগেন্দ্রনাথ। ত্যাগ করলেন ব্রাহ্মসমাজের সাথে সংযোগ। এই নগেন্দ্রনাথই হয়ে উঠলেন পরবর্তীকালে সনাতন ধর্মের প্রচারক "ভাদুড়ী মহাশয়" - মহর্ষি নগেন্দ্রনাথ।
লেখক-সাধন কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
মহর্ষি নগেন্দ্রনাথের মহাজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অজস্র কর্মকাণ্ড। সমাজের সর্বস্তরে শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের জন্য তিনি স্বগ্রামে অবৈতনিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কলকাতায় পেট্রিয়টিক ইনস্টিটিউশন নামে একটি ইংরেজি স্কুল। ছাত্রদের নৈতিক চরিত্র যাতে সুগঠিত হয় তার জন্য বাংলা পদ্যে রচনা করেছিলেন 'প্রতিজ্ঞা শতক'।
নিজে ছিলেন আরবি, ফার্সি, ইংরেজি, বাংলা, সংস্কৃত, হিন্দী, ল্যাতিন, গ্ৰীক প্রভৃতি আটটি ভাষাতে সুপণ্ডিত।
সংস্কৃত ও ইংরাজি সাহিত্যে বুৎপত্তির সাথে সাথে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের দর্শন ও ধর্মগ্রন্থাদিতেও ছিল তাঁর গভীর জ্ঞান। বেদান্ত দর্শনেও তিনি অর্জন করেছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্য। আবার গণিতের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও তাঁর পারদর্শিতা ছিল প্রবাদতুল্য।
তিনি কর্মরত ছিলেন প্ৰথমে জনাই ইংরেজি বিদ্যালয়ে, পরে বালি ইংলিশ হাই স্কুলে প্রধান-শিক্ষকের পদে। এই বালি ইংলিশ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক থাকাকালীনই ১৮৮১ সালে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় নগেন্দ্রনাথের। কথায় কথায় সংস্কৃত, ফার্সি ও আরবি কবিতা উচ্চারণ করা এই জ্ঞান তাপসের - এই মহাসাক্ষাতের পরবর্তী জীবন ছিল সাধনায় নিবেদিত।
মহর্ষি নগেন্দ্রনাথের জন্ম হয়েছিল হাওড়ার পায়রাটুঙ্গির জমিদার পরিবারে। তাঁর পিতা ছিলেন পার্বতীচরণ ভাদুড়ী। পার্বতীচরণ ভাদুড়ী এবং তাঁর ভ্রাতা কালীচরণ ভাদুড়ী - দুজনেই ছিলেন এই ভাদুড়ী বংশের উজ্জ্বল পুরুষ। এঁরা দুজনেই ছিলেন শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত। সঙ্গীতেও ছিল আশ্চর্য দক্ষতা। এঁরা ছিলেন কাশ্যপ গোত্রীয় বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ। এই ভাদুড়ী বংশেরই মহান সন্তান ছিলেন উদয়নাচার্য ভাদুড়ী। এই পরিবারে ছিল শালগ্রাম এবং বাণলিঙ্গের নিত্য পুজোর ব্যবস্থা। বিশেষ বিশেষ পুজোর ক্ষেত্রে পুজোর দায়িত্ব পালন করতেন সাঁতরাগাছির কুল -পুরোহিতরা। তা চণ্ডী পুজো, লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো - যাইহোক। নিত্য পুজোও হতো ষোড়শোপচারে। পুজোতে মানা হতো তন্ত্রোক্ত বিধি। আবার হরিনাম সংকীর্তনও হতো। সপ্তাহে একদিন থাকতো রামায়ণ পাঠের ও গানের ব্যবস্থা। এছাড়াও বিভিন্ন স্থান থেকে পণ্ডিতদের নিয়ে এসে চণ্ডীমণ্ডপে আয়োজন করা হতো শাস্ত্র কথার। জমিদারির বিভিন্ন জায়গায় যেসব পুজো হতো - সেখানেও এই পরিবারের পক্ষ থেকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো।
কিন্তু বেদান্ত দর্শন চর্চা করতে করতে একসময় নগেন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। বলুহাটি ব্রাহ্মসমাজের আচার্য পদ খালি হলে স্থানীয় মানুষেরা তাঁকেই আচার্য হিসেবে বরণ করে নেন। তাঁর সঙ্গীতে, বক্তব্যে সবাই মুগ্ধ হতে থাকেন। তাঁর মতো উচ্চশিক্ষিত মানুষকে ব্রাহ্মধর্মে যুক্ত হতে দেখে জনাই, বালি, উত্তরপাড়া শ্রীরামপুরের অনেকেই আসেন ব্রাহ্ম ধর্মের ছত্রতলে। শোনা যায় - মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথও মুগ্ধ হন নগেন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপচারিতায়। কিন্তু উপবীত ত্যাগের বিষয় নিয়ে তৈরি হয় মতান্তর। নগেন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন - পরমহংস অবস্থা না এলে ব্রহ্ম দীক্ষার সূচক উপবীত ত্যাগের প্রশ্ন ওঠে না। তাই তিনি উপবীত ত্যাগ করতে অস্বীকার করেন। এই মতান্তরের কারণেই শেষপর্যন্ত ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে সব রকম সংযোগ ত্যাগ করেন নগেন্দ্রনাথ। ফিরে আসেন সনাতন ধর্মে। এবার আত্মনিয়োগ করেন সনাতন ধর্মের প্রচার এবং প্রসারে। এই প্রচারে ও প্রসারে তাঁর সঙ্গী হয় - তাঁর জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য এবং নিজের রচিত পরমার্থ সঙ্গীতে কীর্তনের জনমোহিনী শক্তির ব্যবহার।
কাশীর সুমেরু মঠাধীশ শংকরাচার্য প্রমুখ ধর্মপ্রচারকরা তাঁকে 'মহর্ষি' উপাধিতে ভূষিত করেন।
সনাতন ধর্মের প্রচার এবং প্রসারের উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৮১ সালে প্রকাশ করেন সত্য প্রদীপ পত্রিকা, ঘুরে বেড়ান ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে। তাঁর প্রচারিত আদর্শ আজও আলো দেখায় অগণিত মানুষকে।
এটি লেখকের একটি অপ্রকাশিত রচনা।
ছবি সৌজন্যে : শ্রীশ্রীনগেন্দ্র মঠ এবং নগেন্দ্র মিশন, কলকাতা।

0 মন্তব্যসমূহ
Thank you so much for your kindness and support. Your generosity means the world to me. 😊