Breaking

Monday, May 10, 2021

‘সহজপাঠ’-এ প্রকৃতি, সমাজ ও শিক্ষা

‘সহজপাঠ’-এ প্রকৃতি, সমাজ ও শিক্ষা

 



ড. নবকুমার দুয়ারী
ভারতীয় মানববিজ্ঞান সর্ব্বেক্ষণ, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ভারত সরকার, কলকাতা



সারসংক্ষেপ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহু ব্যাপ্ত ও বহু প্রতিভার জীবনকথা প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় তাঁর উপস্থিতি, চিন্তা ও অনুভূতি। তাঁর লেখনীতে বাদ পড়েনি কোন কিছুই। তিনি তার পরিপূর্ণবয়সে ও অভিজ্ঞতায় শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক বালক-বালিকাদের জন্য লিখেছিলেন ‘সহজপাঠ’।পরবর্তীকালে সেই সহজপাঠ বাঙলাভাষী সমস্ত বালক-বালিকাদের পড়ার সুযোগ ঘটেছে। সহজপাঠ বইদুটি সব চাইতে অধিক জননন্দিত হয়েছে। বর্তমান প্রবন্ধে স্বল্প পরিসরে তুলে ধরা হল রবীন্দ্রনাথ কীভাবে সহজপাঠে প্রকৃতি, সমাজ ও শিক্ষাকে সমান্তরালভাবে ছোটদের মধ্যে তুলে ধরেছেন। যা বাংলাবর্ণ (অক্ষর) শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে বিষয় ও ছন্দের বৈচিত্র্যের মেলবন্ধনের অপূর্বতায় সহজ সরল মাধুর্যময়পাঠ্যর মাধ্যমে গ্রহণ করে চলেছে পশ্চিমবঙ্গে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা।



শুরুর কথা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য ও কর্মজীবন আমাদের জীবনের ভারসাম্য ও পথরেখার সন্ধান দিয়ে চলেছে। বহুব্যাপ্ত ও বহুমুখী প্রতিভার জীবনকথা প্রায়প্রতিটি ক্ষেত্রে মনে করিয়ে দেয় তাঁর উপস্থিতি, সুস্পষ্ট চিন্তা ও তীব্র অনুভূতি। অর্থাৎ তিনি লেখনীতে কোন কিছুকে বাদ দেননি। আর এসবের উল্লেখ করেছেন কবিতা ও কথা-কাহিনীতে, চিত্র-চলচ্চিত্রে, নৃত্য ও নাটকে। তাঁকে অন্তরঙ্গে পরিচয়ের নিরিখে দেখলে দেখা যায় তিনি একজন পিতা, স্বামী, বন্ধুবৎসল, স্বজনহারা, রসিক, ভোজন ও রন্ধন বিলাসী, প্ল্যানচেট প্রিয়, শিশুতোষ ও মানবিক ব্যক্তি হিসাবে। আবার কর্মজীবনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যায় তিনি একজন পুস্তক সম্পাদক, আদর্শ জমিদার, পত্র লেখক, গ্রামসংগঠক, বৈষয়িক, চিকিৎসক, পুস্তকের ভূমিকা লেখক, কৃষিবিদ, পল্লীসংগঠক, আশ্রমিক ও জাতীয় শিক্ষক হিসাবে। আবার সৃজনশীলতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যায় চিত্রকরের নেপথ্যে, অভিনেতা, অনুবাদক-অনুস্রষ্টা, নৃত্যভাবনায় ছন্দপথে,বাক্‌শিল্পী, রাগমিশ্রিত গানে, বিদেশী অনুসারী হিসাবে। তাত্ত্বিকার দিক থেকে দেখলে দেখা যায় জীবন দেবতা ভাবনায়, নারী ভাবনায়, অর্থনীতি ও পরিবেশ ভাবনায়, বাংলা ভাষা চর্চায়, বিবাহ প্রসঙ্গে, চলচ্চিত্র চিন্তায়,লোকশিল্প ও শূদ্র ভাবনায়, দৈনন্দিনের নান্দনিকতায়,বিজ্ঞানমানসিকতায় ইত্যাদি বিষয়ে বিচরণ ছিল। যেমন লোকসংস্কৃতি চর্চায়, রাজনৈতিক ভাবনায়, পরিব্রাজক হিসাবে, হিন্দু-মুসলমান মৈত্রী ভাবনায়, দেশপ্রেমিক, আত্মসমালোচক, ভারতীয় দর্শন ইত্যাদিবিষয়ে। এছাড়া আরও অনেক কিছুতে। সমাজে তাঁর অপরিসীম অবদান নিয়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকেআলোচিত হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে বিশিষ্ট গবেষক, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, শিল্পী, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, স্থাপত্য, বিশেষজ্ঞরা রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন বিষয়ে সুক্ষ্ম পর্যালোচনার দৃষ্টিকোণ থেকে কাজকরে চলেছেন। সত্যি কথা বলতে কী,শিশুদের প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক 'সহজপাঠ’কে নিয়ে বোধহয় সেই রূপ গবেষণা হয়নি। এখন সহপাঠ নিয়ে আলোচনার পূর্বে বলা দরকার শিশুতোষ রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে। শিশুদের প্রতি তার অগাধ স্নেহ-ভালবাসা ছিল তা বোঝা যায় তার লেখা অসংখ্য চিঠি-পত্রে, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে লেখা ও সাহিত্য সৃষ্টিতে। যেমন একটা উদাহরণ হল অনিল চন্দ ও রাণী চন্দর ছেলে তার বালক বন্ধুকে নিয়ে একবার কবির সহি সংগ্রহ করার সময় তার খাতায় লিখে ছিলেন একটি ছোট্ট ছড়া।

তোমার নাম ছবি আমার নাম রবি।

নামে নামে মিলে গেল, রক্ষা পেল কবি।

এছাড়া অন্যান্য কবিতাগুলি হল-

“মাগো আমায় ছুটি দিতে বল

সকাল থেকে পড়ছি যে মেলা।

এখন আমি তোমার ঘরে বসে

করব শুধু পড়া পড়া খেলা”।

অন্য এরকম আরটি ছড়া হল –

“নেই বা হলেম যেমন তোমার

আম্বিকে গোঁসাই

আমি তো মা চাই নাহতে

পণ্ডিত মশাই।"



শিশুতোষ রবীন্দ্রনাথ

কবি বিশ্বের সমস্ত শিশুর প্রতি যে অপরিসীম ভালবাসা ও মমত্ববোধ স্নেহশীল ছিলেন তা বোঝাযায়তাঁর সৃষ্টি দুটি কাব্যগ্রন্থের বিভিন্ন কবিতায়। যেমন - খেলা, খোকা, বীরপুরুষ, মাঝি, রাজার বাড়ি, লুকোচুরি, বিদায়, শিশু ভোলানাথ, রবিবার, তালগাছ, শিশুর জীবন, ইচ্ছামতী, দুয়োরাণী, পুতুল ভাঙা, বাউল, দুষ্টু ইত্যাদি। আবার অন্যদিকে শিশুদেরকে নিয়ে তার ছোটগল্পের সংখ্যাও কম নয়। যেমন - পোস্টমাস্টার (রতন), কাবুলিওয়ালা (মিনি), সুভা (সুভা), ছুটি (ফটিক), দিদি (নীলমণি), জীবিত মৃত গল্পে (খোকা), খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন (খোকাবাবু) ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ রাজর্ষি (হাসি ও তাতা) ও গোরা উপন্যাসে সমগ্র শিশুদের প্রীতির কথা বলেছেন। এছাড়া এই প্রীতির কথা বলেছেন ডাকঘর (অমল), শরৎ উৎসব ও মুকুট নাটকের মধ্য দিয়ে। শিশুবিষয়ক চিন্তাধারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় শিশুদের ব্যথা-বেদনা ও অনুভূতির কথা তিনি তাঁর নিজের বাল্য অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির মাধ্যমে সেসব নানা লেখায় ব্যক্ত করেছেন। নিজের জীবন কথাকে শিশুদের উপযুক্ত করে বা শিশুদের মতো করে ‘ছেলেবেলা’ গ্রন্থেফুটিয়েতুলেছেন।শিশুমনের অভিব্যক্তিকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন- শিশুভোলানাথ, ছড়া ও ছড়া, ছড়ার ছবি, খাপছাড়াকাব্যের অজস্র ছড়ার মাধ্যমে। তিনি ছড়ায় ছবি কাব্যের ভূমিকায় লিখেছেন ‘এই ছড়াগুলি ছেলেদের জন্য লেখা, সবগুলো মাথায় একনয়;রোলারচালিয়ে প্রত্যেকটি সমান সুগম করা হয়নি। এর মধ্যে অপেক্ষাকৃত জটিল যদি কোনটা থাকে তবে তার অর্থ হবে কিছুটা দুরূহ। তবু তার ধ্বনিতে থাকবে সুর। ছেলেমেয়েরা অর্থ নিয়ে নালিশ করবেনা। খেলা করবে ধ্বনি নিয়ে। ওরা অর্থলোভী জাতি নয়।’



শিক্ষা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথতাঁর জীবন- দর্শনের মাধ্যমে গভীরভাবে বুঝেছিলেন যে, প্রকৃতির অনাবিল সংস্পর্শের মধ্যে বেড়ে ওঠাই হল শিশুরআনন্দ।সেই কারণে তিনি গড়ে তুলেছিলেন শান্তিনিকেতনের মতো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আর এখানে শিক্ষাদানের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃতি, কর্ম, শ্রম ও শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো। তাঁর কাছে বিদ্যাচর্চা হল জীবনচর্চারঅপর নাম। এ সম্বন্ধে অনেক লেখাই লিখেছেন। যেমন - শিক্ষার হেরফের, ধর্মশিক্ষা, তপোবন, শিক্ষাবাহন, শিক্ষাসংস্কার, শিক্ষা সমস্যা, জাতীয় বিদ্যালয় ইত্যাদি রচনায়। তিনি তাঁর জীবন দিয়ে বুঝেছিলেন প্রকৃত শিশুবিকাশ ও শিশুশিক্ষার কথা। প্রকৃতির কোলে মুক্তভাবে শিশুমনোবিকাশের কথা ভেবেছিলেন শেষ বয়সেও। যদি শিক্ষার হেরফের প্রবন্ধের শুরুতে চোখ রাখা যায় তাহলে দেখা যাবে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের দেহ তিন হাতের মধ্যে বদ্ধ, কিন্তু তাই বলিয়া সেই সাড়ে তিন হাত পরিমাণ গৃহনির্মাণ করিলেই চলে না। স্বাধীন চলাফেরার জন্য অনেকখানি স্থান রাখা আবশ্যক, নতুবা আমাদের স্বাস্থ্য এবং আনন্দের ব্যাঘাত হয়। শিক্ষা সম্বন্ধেও একই কথা খাটে। যতটুকু কেবলমাত্র শিক্ষা আবশ্যক তাহারই মধ্যে শিশুদিগকে একান্ত নিবন্ধ রাখিলে কখনই তাহাদের মন যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িতে পারে না। অত্যাবশ্যকীয় শিক্ষার সহিত স্বাধীন পাঠ না মিশাইলে ছেলে ভালো করিয়া মানুষ হইতে পারে না। বয়ঃপ্রাপ্ত হইলেও বুদ্ধিবৃত্তি সম্বন্ধে সে অনেকটা পরিমাণে বালক থাকিয়া যায়’। রবীন্দ্রনাথ আবার শিক্ষা বিধি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘শিশুদের পালন ও শিক্ষনের যথার্থভাব পিতামাতার উপর। কিন্তু পিতামাতার সে যোগ্যতা অথবা সুবিধা না থাকতেই অন্য উপযুক্ত লোকের সহায়তা আবশ্যক হইয়া উঠে। এমন অবস্থায় গুরুকে পিতামাতা না হইলে চলে না’। প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষায় শিক্ষকের স্থান জন্মদাতা পিতার সমতুল্য ভাবা হয়েছে। পঠন-পাঠনের সঙ্গে প্রকৃতি ও মানব সমাজ সম্পর্কিত নানা মূল্যবোধের বিকাশসাধন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্কের মধ্যে গড়ে উঠেছিল।রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা সমস্যা প্রবন্ধে লিখেছেন – ‘ইস্কুল বলিতে আমরা যাহা বুঝি সে একটা শিক্ষা দেবার কল। মাস্টার এই কারখানার একটা অংশ। সাড়ে দশটার সময় ঘন্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে। কল চলিতে আরম্ভ হয়, মাস্টার ও মুখ চলিতে থাকে,চারটের সময় কারখানা বন্ধ হয়। তখন মাস্টার কল ও মুখবন্ধ করেন; ছাত্ররা দুই চারপাতা কলে ছাঁটা বিদ্যা লইয়া বাড়ি ফেরে। তারপর পরীক্ষার সময় এইবিদ্যার যাচাই হইয়া তাহার উপর মার্কা পড়িয়া যায়’। শিশু শিক্ষাই হোক আর বড়ো মানুষের শিক্ষাই হোক প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি প্রকৃতি পরিবেশ ও সমাজ থেকে জ্ঞান সঞ্চয়ের উপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন। খোলা আকাশ, বাতাস, গাছপালা ও জীবজন্তুর মানুষের সুপরিণতির জন্য একান্ত দরকার। একদিন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় তার স্বীকৃতি ছিল। অরণ্য আর গুরুগৃহ দুই-ই আমাদের শিক্ষার জন্য একান্ত প্রয়োজন বলে রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন। তাই তিনি শিশুদের সার্বিক বিকাশের কথা ভেবে শিক্ষার বিশেষভাবে উপযোগীপুস্তক সহজপাঠ (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ) একরকম শেষ বয়সে (১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দ) লিখেছিলেন। তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ছোটদের জন্য লেখা এই 'সহজপাঠ'।

প্রতিটি শিক্ষিত বাঙালীর শৈশবে অন্তত তিনটি অতি পরিচিত বই পড়ে থাকে। যেমন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বাপরিচয়’ (প্রথম ভাগ, ১৮৫৫), যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘হাসিখুশি’ (প্রথম ভাগ, ১৮৯৮) ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সহজপাঠ’ (প্রথম ভাগ, ১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দ) দুটি খণ্ড। এই তিনটি বই দীর্ঘ চিন্তাভাবনা ও অভিজ্ঞতায় ছোটদের উদ্দেশ্যে লেখা তাদের মতো করে। শুধু তাই নয় বইগুলি বিজ্ঞানসম্মত। ফলে এই তিনটি বই আজও আমাদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ হিসাবে বিবেচিত হয়। এই প্রসঙ্গে বই তিনটির গোড়ার কথা না বললেই নয়। ‘বর্ণপরিচয়’ ও ‘হাসিখুশি’ লেখা হয়েছে বৃহত্তর শিশু শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে। কিন্তু ‘সহজপাঠ’ লেখা হয়েছিল, কেবল শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক বালক-বালিকাদের জন্য। সেই সাথে তিনি আরও কয়েকটি বই লিখেছিলেন যেমন ‘সংস্কৃতি শিক্ষা’,‘ইংরাজী সহ শিক্ষা’ ও ‘ইংরাজী পাঠ’। এগুলি কেবল শান্তিনিকেতনের মধ্যেসীমাবদ্ধ থেকেছে। কিন্তু পরবর্তীকালে ‘সহজপাঠ’ বইটি বাংলা ভাষাভাষী সমস্ত বালক-বালিকার পড়ার সুযোগ ঘটেছে এবং এই বইটি সব চাইতে অধিক জননন্দিত হয়েছে। এখন দেখা যাক রবীন্দ্রনাথ তাঁর পরিপূর্ণ বয়সে ছোটদের পাঠ্য পুস্তক ‘সহজপাঠ’ লেখার পটভূমিকার কথা।



সহজপাঠ - প্রথম ভাগ

‘সহজপাঠ’ রচনার অন্তরালে চোখ রাখলে দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর শৈশবে পড়েছিলেন মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশুশিক্ষা’। তখন বয়স ছিল ৩ বছর ৮ মাস।তাঁরশিশু শিক্ষার যে ধ্বনি ও ছন্দ তা‘সহজপাঠ’ রচনায় বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছে। আর প্রভাব বিস্তার করেছে। আর প্রভাব বিস্তার করেছে কবির শৈশবে বেড়ে ওঠার স্মৃতির অনুভব ও অনুভূতির নানান দিক। ‘সহজপাঠ’ লেখার সময় বেশ কয়েকবার খসড়া তৈরী করেছিলেন।কেমন ছিল সেইসব খসড়া? এসম্বন্ধে বর্ণনা রয়েছে শান্তিনিকেতনের এক প্রাক্তন শিক্ষক তথা অনুসন্ধিৎসু গবেষক পূৰ্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের ‘রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ’ লেখায়। আর খসড়াটি পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের ডায়েরী জাতীয় একটি ‘পকেট বুক’-এ। সবশেষে খসড়াটির অনেকখানি পরিবর্তন,পরিমার্জন ও পরিশীলিত করা হয়েছে। পূর্ণানন্দ লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ব্যঞ্জনবর্ণের পাঠ প্রথম ও স্বরবর্ণের পাঠ রচনা করেন। সহজপাঠের স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণ উভয় মিলযুক্ত। সেখানে ছন্দ ও ভাবের সমর্থন ঘটেছে। কিন্তু ১৩০২ বঙ্গাব্দে রচিত তার এই খসড়াতে শুধু স্বরবর্ণের পাঠযুক্ত মিল খুঁজে পাওয়া যায়।ব্যঞ্জনবর্ণের পাঠে মিলের কিছু নিদর্শন থাকলেও তাতে কোন সচেতন প্রয়াসের প্রমাণ নেই। আবার পরিশীলীত ‘সহজপাঠ’ বইটির প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন যে, ‘বাংলাভাষায় রত্নস্বরূপ এই গ্রন্থ যেনপ্রতিভার বেলাভূমিতে সংক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র নিটোল স্বচ্ছ্ব একটি মুক্তো। এর ছত্রে ছত্রে প্রকাশ পেয়েছে চারিত্র্য, আর সেই সঙ্গে ব্যবহার- যোগ্যতা, পরিশীলিত বিরল হওয়ার মধ্যে নিকটতম অন্যচেতনা। মহত্তম বাণীসিদ্ধির সরলতম উচ্চারণ।কী ছন্দোবদ্ধ ভাষা, কী কান্তি তার, কীরকম চিত্ররূপে মালা গেঁথে চলেছে, অথচ কঠিনভাবে প্রয়োজনের মধ্যে আবদ্ধ থেকে, শিশুমনের গণ্ডি কখনও না ভুলে বর্ণশিক্ষার উদ্দেশ্যটিকে অক্ষরে অক্ষরে মিটিয়ে দিয়ে, পদ্যছন্দের বৈচিত্র্য, মিলের অপূর্বতা, অনুপ্রয়াসের অনুরণন- সমস্তই এখানে এনেছেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু সমস্তই আঁটোমাপের শাসনের মধ্যে দেখেছেন। কোনখানেই পাত্র ছাপিয়ে উপচে পড়েনি।

বাংলা বর্ণমালায় মোট৫২টি অক্ষর রয়েছে। এরমধ্যে ১২টি হল স্বরবর্ণ। আর অবশিষ্ট হলব্যঞ্জনবর্ণ। বিদ্যাসাগর তাঁর লেখা বর্ণপরিচয়ে স্বরবর্ণে‘ঋ’ ও দীর্ঘই কে বাদ রেখেছিলেন। এমনকি বাদ রেখেছিলেন ‘ক্ষ’কেও। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ মদনমোহনের মতোএককবর্ণের তালিকায় সুচিন্তিতভাবে রেখেছেন ‘ক্ষ’ কে। যেমন-

শালমুড়ি দিয়ে হ ক্ষ

কোণে বসে কাশে খ ক্ষ।



অবশ্য এ প্রসঙ্গে বলা যায় যে, তিনি আবার ৎ,ড়,ঢ়, ং, ঃ ও ঁ কে বাদ রেখেছেন। ছড়া সহযোগে যে বর্ণমালাকে চেনা যায় ও মনে রাখা যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল ‘সহজপাঠ’। শুধু তাই নয় শিশুর কথা বলাথেকে শুরু করে তার বেড়ে ওঠা, চারিপাশের আর্থ-সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে ছড়া, ছবি, কবিতা ও ছোট ছোট গদ্যের মাধ্যমে পরিচয় ঘটানো। যেমন

অ, আ

ছোট খোকা বলে অ আ

শেখেনি সে কথা কওয়া।


ঘন মেঘ বলে ঋ

দিনবড়ো বিশ্রী।



শ ষ স

শ ষ স বাদল দিনে

ঘরে যায় ছাতা কিনে।

ক খ গ ঘ

ক খ গ ঘ গান গেয়ে

জেলে ডিঙি চলে বেয়ে।



ত থ দ ধ

ত থ দ ধ বলে ভাই

আম পাড়ি চলো যাই।



এইরূপ মোট উনিশটি ছড়ায় একটি দুটি বা চারটি বর্ণমালার ক্রম অক্ষর-এর পরিপ্রেক্ষিতে দুই লাইনের দুই অক্ষর বিশিষ্ট শব্দ দিয়ে ছড়া রচনা করেছেন। প্রতিটি ছড়া সরল-সাবলীল অর্থবহ।যা শিশুমনে সহজে এক বিশেষ ছন্দের মধ্যে দাগ কাটে। প্রতিটি ছড়ার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের কথা।গ্রামীণ জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে ছবি বর্ণমালার চেনানোর প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়েছে অত্যন্ত সুন্দরভাবে।যেমন ক্ষীর, খই, দই, কুকুরের ডাক, আকাশে মেঘ, শ্রমজীবি মানুষের কর্মকাণ্ডের আংশিক ছবি- নদীতে জেলের ডিঙি, হাটে বোঝা নিয়ে যাওয়া ও দিনভর ধান কাটা, শিশু কান্না, ঢাক-ঢোল, গরুর গাড়িতে ধান নিয়ে বাড়ি যাওয়া ইত্যাদি। কোন কিছু যেন বাদ পড়েনি। এই ছড়াগুলির সাথে নন্দলাল বসুর তুলিতে আঁকা সাদা কালো ছবিগুলি এখানে আরও এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে। মনে হয় একে অপরের পরিপূরক। কবি রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন যে শিশুদের প্রথম পাঠ্যপুস্তকে ছবির প্রয়োজনীয়তার কথাও। তিনি নিজেও এক আধুনিক চিত্রী। চিত্রশিল্পী হিসাবে তাঁর আবির্ভাব হঠাৎ বলে মনে হলেও এর পূর্বে এ নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ভেবেছেন। যেমন মালতী পুঁথি থেকে শুরু করে শিলাইদহ পর্ব ছুঁয়ে‘পুরবী’ কাব্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। ছড়া সহযোগে বর্ণমালা সুন্দরভাবে চেনানোর পর্ব শুরু হয় সহজপাঠের প্রথম পাঠে।

বান থাকে বাঘ

গাছে থাকে পাখি।

জলে থাকে মাছ

ডালে আছে ফল।

পাখি ফল খায়।

পাখা মেলে ওড়ে।

………………

ওরা সব মৌমাছি।

এখানে মৌচাক

তাতে আছে মধু ভরা।

এখানে শিশুদের সাথে পরিচয় ঘটিয়েছেন পারিপার্শ্বিক জীবজন্তুর সাথে। বাদ পড়েনি ছোট মৌমাছিও। বলেছেন এরা কোথায় থাকে, কি খায়, দেখতে কেমন এসব কথা। যা খুব সাধারণ বলে মনে হলেও কিন্তু দুটি অক্ষরের শব্দ দিয়েঅর্থবহ ধারাবাহিকতাকে বজায় রেখে আমাদের কাছে এক চমকপ্রদ যাদু সৃষ্টি করেছেন।পরের ছড়াটি হল-

আলোহয়

গেলভয়।

চারিদিক

ঝিকি মিক।

দিঘি জল

ঝল মল

………

গুরুদাস

করে চাষ।

রবীন্দ্রনাথের গ্রামীণ জীবনের সাথে যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও মমত্ববোধ রয়েছে তা সহজে বোঝা যায় তাঁর লেখা সহজপাঠ (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ) পুস্তকের প্রতিটি ছড়ায়, কবিতায় ও গদ্য পাঠের মধ্য দিয়ে। উপরের ছড়াটির মধ্যে ফুটে উঠেছে অন্ধকারকে সরিয়ে সূর্য ওঠা, প্রকৃতির শোভা, কর্মজীবন পুরুষের নানা কাজে ব্যস্ততা।

দ্বিতীয় পাঠে বর্ণনা করেছেন গ্রামের একটি পরিবারের পূজার দিন। এদিন সকাল থেকে রাত্রি পূজার আয়োজনে কে কি কি কাজ করে। রাত্রির পরিবেশ কিরূপ হয় তাও উল্লেখ করেছেন। যেমন রাতে হবে আলো। লাল বাতি, নীলবাতি। কত লোক খাবে। কত লোক গান গাবে। সাতদিন ছুটি। তিনিভাই মিলে খেলা হবে। এক্ষেত্রে শিশু শিখবে দুই অক্ষরে ছোট ছোট শব্দদের ব্যবহার ও শব্দ চয়ন। এমনকি শব্দের বানানও। শুধু তাই নয় শিশুদের প্রিয় যে দোলনা এ নিয়ে লিখেছেন- ‘ছোট খোকা দোলা চড়ে দোলে’।আবার কলাপাতার কথাও বলেছেন। যেমন- ‘মুটে আনে সরা খুরি কলাপাতা’। এখানে তিন ধরনের আধারের কথা সহজ ভাবে পর পর উল্লেখ করেছেন।

তৃতীয় পাঠে- একই ভাবে শব্দ বিন্যাসের মূর্চ্ছনায় ও শব্দের তালে তালে একটি সামাজিক সম্পর্কের কথাও গদ্যে উল্লেখ করেছেন। যেমন- ঐ সাদা ছাতা। দাদা যায় হাটে,……… মামা আনে চাল-ডাল। মা বলে, খাজা চাই, গজা চাই, আর চাই ছানা………আশা দাদা তার ভাই, কালা কাল ঢাকা ফিরে যাবে। এরপরের কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথ গ্রাম প্রকৃতির এক নৈস্বর্গীয় আনন্দের কথা তুলে ধরেছেন।

নাম তার মতিঝিল, বহুদূর জল,

হাঁসগুলি ভেসে ভেসে করে কোলাহল।

পাঁকে চেয়ে থাকে বক, চিল উড়ে চলে,

মাছরাঙা ঝুপ্ করে পড়ে এসে জলে।



আবার একটি রাত্রির শেষে বর্ণনা করেছেন একটি সুন্দর কবিতায়।

কালো রাতি গেল ঘুচে,

আলো তারে দিলমুছে।

পুব দিকে ঘুম ভাঙা

হাসে উষা চোখ রাঙা

………………

জলে জলে ঢেউ ওঠে

ডালে ডালে ফুল ফোটে।



এখানে রাত্রি অতিবাহিত হওয়ার সময় পরপর আকাশ, আলো, সূর্য, জল, ফুল ও পাখির মধ্যে কি কি ঘটনা ঘটে অর্থাৎপ্রকৃতি কিরূপ সেজে ওঠে তা একটি দিনের বর্ণনা এই আঠারো লাইনের কবিতায় তা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।



চতুর্থ পাঠ-এ দুই থেকে চারটি অক্ষরে শব্দ নিয়ে একটি গ্রামের চিত্রএঁকেছেন। চলো ভাই নীলু। এই তালবন দিয়ে পথ। তারপরে তিলখেত। তারপরে দিঘি। জল খুব নীল। ধারে ধারে কাদা। জলে আলো ঝিলমিল করে।বক মিটিমিটি চায় আর মাছ ধরে।পরের কবিতাটিতে গ্রামের একটি পাড়ার বর্ণনা করেছেন কয়েক লাইনের কবিতায়। যেমন গাছপালা, দিঘির কথা তুলে ধরেছেন, তেমনি আবার কোথায় কে কি কাজে ব্যস্ত তাও কবির চোখ এড়ায়নি।

ছায়ার ঘোমটা মুখে টানি

আছে আমাদের পাড়াখানি

দিঘি তার মাঝখানটিতে

তালবন তার চারিভিতে।

……………………

ঢেঁকি পেতে ধান ভানে বুড়ি

খোলা পেতে ভাজে খই মুড়ি।

বিধু গয়ালানি মায়ে পোয়

সকাল বেলায় গোরু দোয়।



আঙিনায় কানাই বলাই

রাশি করে সরিষা কলাই

বড়োবউ মেজোবউ মিলে

ঘুঁটে দেয় ঘরের পাঁচিলে।

নদী-দিঘি, জল-জমি, বন-জঙ্গল, আকাশ-বাতাস, ঋতু-বৈচিত্র, চাঁদ-সূর্য, গাছপালা-জীবজন্তু, ফুল-ফল, পাখী ও মানুষকে নিয়ে আরও অনেক কবিতা ও গদ্যের মধ্যে সহজ ও নিখুঁত ভাবে তুলে ধরেছেনসম্পূর্ণ সহজপাঠ জুড়ে। যেমন পরের কবিতা ও গদ্যাংশগুলি হল- আজ খুব শীত। কচুপাতা থেকে টুপ টুপ করে হিম পড়ে।ঘাস ভিজে। পা ভিজে যায়। দুখি বুড়ি উনুন-ধারে উবু হয়ে বসে আগুন পোহায় আর গুন গুন গান গায়।

আমলকী-বন কাঁপে, যেন তার

বুক করে দুরু দুরু।

পেয়েছে খবর,পাতা- খসানোর

সময় হয়েছে শুরু।



আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে

বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।

…………………………



আষাঢ়ে বাদল নামে, নদী ভরো ভরো

মাতিয়া ছুটিয়া চলে ধারা খরতর।

…………………………



দুই কুলে বনে বনে পড়ে যায় সাড়া,

বরষার উৎসবে মেতে ওঠে পাড়া।



পৈতে হবে চিঠি পেয়ে মৈনি মাসি আজ এল। মৈনিমাসি বৈশাখ মাসে ছিল নৈনিতালে। তাকে যেতে হবে চৈবাসা। তার বাবা থাকে গৈলা।…………

কাল ছিল ডাল খালি

আজ ফুলে যায় ভরে।

বল দেখি তুই মালী

হয় সে কেমন করে।

ভোর হল। ধোপা আসে। ঐ তোলোকাধোপা। গোরাবাজারে বাসা। ওর খোকা খুবমোটা, গাল ফোলা।

দিনে হই এক মতো রাতে হই আর,

রাতে যে স্বপন দেখি মানে কী যে তার।

আমাকে ধরিতে যেই এল ছোট কাকা ।

স্বপনে গেলাম উড়ে মেলে দিয়ে পাখা।

দুই হাত তুলে কাকা বলে, থামোথামো।

যেতে হবে ইস্‌কুলে, এই বেলা নামো।



উপরের কয়েকটি কবিতা ও গদ্যে যে কেবল ঋতু বৈচিত্র, প্রাকৃতিক ও সমাজিক পরিবেশকে শিশুদের কাছে তুলে ধরেছেন শুধু তাই নয়। গ্রামের পুজো ও উৎসবের কথাও বলেছেন। সেখানে যে সমস্ত স্থান – এর নাম উল্লেখ করেছেন তার অবস্থানও পরোক্ষভাবে এর গুরুত্বর কথাও বলেছেন। আবার ব্যক্তি নামের মধ্যে ধরা পড়েছে তার আর্থিক অবস্থা ‘দুখি বুড়ি’ ও তার পরিস্থিতির কথা। যেমন উনুন-ধারে উবুহয়ে বসে আগুন পোহায় আর গুন গুন গান গায়। সহজ পাঠের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি পাতায় নজর রাখলে ধরা পড়ে কী সুন্দরভাবে রবীন্দ্রনাথ শিশুদেরকে পরপর বর্ণমালার প্রতিটি বর্ণেরসঙ্গে পরিচয় ঘটিয়েছেন। আবার আ-কার, ই-কার, ঈ-কার, উ-কার, ঊ-কার, ঋ-কার, এ-কার, ও-কার, ঔ-কার এর যে ব্যবহার তা ধীরে ধীরে কবিতা ও গদ্যের মধ্যে অত্যন্ত সুন্দর ও সহজভাবে দুটি বা চারটি বর্ণের মধ্যে তুলে ধরেছেন। যেমন-

আ-কার-- রাম বনে ফুল পাড়ে। গায়ে তার লাল শাল। হাতে তার সাজি।

ই-কার—বিনিপিসি,বামি আর দিদি ঐ দিকে আছে।

ঈ-কার-- বুড়ি দাসী আনে জল। ………বনে নদী ছিল, ও নিজে গিয়ে জল খেত। দীনু এই পাখি পোষে।

উ-কার-- জবা ফুল তোলে, বেল ফুল তোলে। বেল ফুলসাদা, চুপ করে বসে ঘুম পায়। চলো ঘুরে আসি। ফুল তুলে আনি।

ঊ-কার-- বেলা হল। মাঠ ধু ধু করে। থেকে থেকে হূ হূ হাওয়া বয়। দূরে ধুলো ওড়ে। চুনি মালী কুয়ো থেকে জল তোলে। আর ঘুঘু ডাকে ঘূ ঘূ।

এ-কার-- বেলা যায়। তেল মেখে জলে ডুব দিয়ে আসি। তারপর খেলা হবে। একা একা খেলা যায় না। ঐ বাড়ি থেকে কয়েকজন ছেলে এলে বেশ হয়।

ঐ-কার-- শৈল এল কৈ? ঐ যে আসে ভেলা চড়ে, বৈঠা বেয়ে। ওর আজ পৈতে। ও কৈলাশ, দৈ চাই। ভাল ভৈষা দৈ আর কৈ মাছ। শৈল আজ খৈ দিয়ে দৈ মেখে খাবে।

ও-কার-- ভোর হল। ধোবা আসে। ঐ তোলোকাধোবা। গোরাবাজারে বাসা। ওর খোকা খুব মোটা, গাল ফোলা।

ঔ-কার–- এসো, এসোগৌরীএসো। ওরে কৌলু, দৌড়ে যা। চৌকিআন্। গৌর, হাতে ঐ কৌটো কেন?ঐ কৌটো ভরে মৌরি রাখি। মৌরি খেলে ভাল থাকি।

চন্দ্রবিন্দু--বাঁশ গাছে বাঁদর। যত ঝাঁকা দেয়। ডাল তত কাঁপে। ওকে দেখে পাঁচুভয় পায়, পাছে আঁচড় দেয়।



আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে

বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।



‘সহজপাঠে’ সামাজিক পরিবেশের মধ্যে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তুলে ধরেছেন আর্থিক ও সামাজিক বৈষম্যের ভেদা-ভেদের ছবি। অভাবী জাত পেশায় শত মানুষের দুঃখময় দিনযাপন। আবার ধনীব্যক্তির আড়ম্বরপূর্ণ সামাজিক আচার অনুষ্ঠানও। প্রথম উদাহরণ স্বরূপ দুটি কবিতায় ফুটে উঠেছে অভাবী মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।

মধু রায়

খেয়াবায়।

জয় লাল

ধরেহাল।

অবিনাশ

কাটে ঘাস।

হরিহর

বাঁধে ঘর।

পাতু পাল।

আনে চাল।

দীননাথ

রাঁধে ভাত।

গুরুদাস

করে চাষ।

ঐ যায় ভোলামালী। মালা নিয়ে ছোটে। আবার একটি কবিতায় উল্লেখ্য-

ঢেকি পেতে ধান ভানে বুড়ি,

খোলা পেতে ভাজে খই মুড়ি।

বিধু গোয়ালানি মায়ো পোয়,

সকাল বেলায়গোরু দোয়।

এত দুঃখ দারিদ্রের জীবন-যাপনের সঙ্গে সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সহজপাঠের অষ্টম অধ্যায়ে এসেছে বিত্তশালীর কথা।



ঐকোঠাবাড়ি। ওখানে আজ বিয়ে। তাই ঢের ঘোড়া এল, গাড়ি এল, এক জোড়া হাতি এল। মেজো মেসো হাতি চড়ে আসে। ওটা বুড়ো হাতি। তার নাতি ঘোড়া চড়ে। কালোঘোড়া। পিঠে ডোরা দাগ। পায়ে তার ফোড়া, জোরে চলে না। ঢোল বাজে। ঘোড়া ঘোর ভয় পায়।



ধনী ব্যক্তিদের বিয়েতে কেমন আয়োজন হয়, কাদের সহযোগিতায় এই অনুষ্ঠান হয়ে থাকে এবং কী ধরনের যানবাহন লাগানো হয়েছে তার উল্লেখ রয়েছে। শুধু তাই নয়, এখানে শিশু মনে প্রশ্ন জাগে বুড়ো হাতি ও অসুস্থ ঘোড়াটিসম্বন্ধে। এই হৃদয়হীনতার ছবি তাদের মনে গভীরভাবে দাগ কাটে। সঞ্চয় হয় করুণা। আবার পল্লিগ্রামে নানান সমস্যা, অভাব অনটনের অর্থাৎ বিভিন্ন প্রকার প্রতিকূলতাকে মেনে নিয়ে জীবনের গতিতে বয়ে নিয়ে চলেছে। যেমন- হরি মুদি, চুনি মালী, বিধু গয়লানি ও তামিজ মিঞা।

এজন্য আলোকপাত করা যাক সহজপাঠ – দ্বিতীয় ভাগ-এ



সহজপাঠ - দ্বিতীয় ভাগ

সহজপাঠে দ্বিতীয় ভাগের শেষে যে পর্যন্ত বর্ণমালার সঙ্গে শিশুদের পরিচয় ঘটেছিল, ঠিক তারপরে পরেই সহজপাঠ–- দ্বিতীয় ভাগ-এ শুরু হয় বাকী বর্ণগুলির সাথে গদ্য ও কবিতার মাধ্যমে ধাপে ধাপে পরিচয়। যেমন – ঢং ঢং করে নটা বাজলো। বংশ ছাতা মাথায় কোথায় যাবে? আজ ‘আদ্যনাথ বাবুর কন্যার বিয়ে-তাঁর এই শল্যপুরের বাড়িতে। কেউবা ব্যাট্বলখেলছে। নিত্যশরণ ওদের ক্যাপ্‌টেন। রঙ্গলালবাবুও এখনি আসবেন। আর আসবেন তার দাদা বঙ্গবাবু।

এত সহজে ছোট ছোট শব্দ ও বাক্যপ্রয়োগে ও চয়নে বাংলা বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষর শিশুদেরকে চেনানো ও এর ব্যবহার শেখানো যায় তা রবীন্দ্রনাথ বলেই সম্ভব হয়েছে। আর তাঁর পক্ষে আরও সম্ভব হয়েছে সহজপাঠে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবে স্থান ও ব্যক্তিদের নাম নির্ধারণ-এর ক্ষেত্রে। যা আমাদের সকলকে মোহিত করে।

সহজপাঠ- দ্বিতীয় ভাগেও সুন্দরভাবে রবীন্দ্রনাথ ফুটিয়ে তুলেছেন পল্লিপ্রকৃতি ও পল্লিসমাজের নানান চিত্র। যা শিশুমনে গভীর দাগ কাটে এবং পরিচয় ঘটে প্রকৃতি, সমাজ ও সংস্কৃতির। কবিচেষ্টা করেছেন আমাদের এই রূপসী বাংলার রূপকে ছোটোদের কাছে তাদের মতো করে চেনাতে ও বোঝাতে। আর এই রূপের আড়ালে অবশ্য লুকিয়ে থাকা পল্লীসমাজের নানান দুঃখ, দারিদ্র, বঞ্চনা আর অপমানের কথাও। দ্বিতীয়ভাগে কবিতা ও গদ্যের মধ্যে উল্লেখ করেছেন ঋতু বৈচিত্রের কথা কবিতা ও গদ্যে বর্ণনা করেছেন। যেমন

বাদল করেছে। মেঘের রং ঘন নীল।

বর্ষা নেমেছে। গর্মী আর নেই। থেকে থেকে মেঘের গর্জনআর বিদ্যুতের চমকানি চলেছে।

……………………

শ্রাবণ মাসের বাদ্‌লা। উস্রিতে বান নেমেছে।





সেদিন ভোরে দেখি উঠে

বৃষ্টি বাদল গেছে ছুটে,

রোদ উঠেছে ঝিল্‌মিলিয়ে

বাঁশের ডালে ডালে।





তিনটি শালিক ঝগড়া করে

রান্নাঘরের চালে।

শীতের বেলায় দুই প্রহরে

দূরে কাদের ছাদের প’রে

ছোট্ট মেয়ে রোদ্‌দুরে দেয়

বেগনি রঙের শাড়ি।



প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করতে ভোলেননি। এখানে দুর্গতি বলতে বন্যাকে তুলে ধরেছেন। যেমন – কর্ণফুলি নদীতে বন্যা দেখা দিয়েছে। সর্ষে খেত ডুবিয়ে দিল। দুর্গানাথের আঙিনায় জল উঠেছে। তার দরমার বেড়া ভেঙ্গে পড়ল। বেচারা গোরুগুলোর বড়োদুর্গতি।

গাছপালা ও জীবজন্তু কবির প্রায় সমস্ত লেখায় পাওয়া যায়। যেমন-

ওইখানে মা পুকুর-পাড়ে

জিয়াল গাছের বেড়ার ধারে

হেথায় হববনবাসী,

কেউ কোথাওনেই।

………………

বাঘ ভাল্লুক অনেক আছে-

আসবেনা কেউ তোমার কাছে,

অমনি যত বনের হরিণ

আসবে সারে সারে।

ওইখানেতে ময়ূর এসে

নাচ দেখিয়ে যাবে।

শালিকরা সব মিছিমিছি

লাগিয়ে দেবে কিচিমিচি,

কাঠবেড়ালি লেজটি তুলে

হাত থেকে ধান খাবে।



উল্লাপাড়ার মাঠেশেয়ালডাকছে হুক্কা হুয়া। এ ছাড়া উল্লেখ রয়েছে কুকুরের বাচ্চার ডাক, পেঁচার ডাক, ঝিঁঝিঁপোকার ডাক, বিড়ালের ডাক ইত্যাদি। কবি উল্লেখ করেছেন সংস্কৃতি চর্চার কথাও। সেখানে কংসবধের অভিনয় হবে। আজ মহারাজ হংসরাজ সিংহ আসবেন। কংসবধ অভিনয় তাকে দেখাবে। রবীন্দ্রনাথ বিয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ এক সামাজিক অনুষ্ঠানকে সহজপাঠে ঠাই করে দিয়েছেন। যেমন – আজ আদ্যনাথবাবুর কন্যার বিয়ে-তাঁর এই শল্যপুরেরবাড়িতে। কন্যার নাম শ্যামা। বরের নাম বৈদ্যনাথ। বরের বাড়ি অহল্যাপাড়ায়। ……… এখানে য-ফলা ও ই-কারের পর পর প্রয়োগ কত সুন্দরভাবে করেছেন তা সহজে অনুমেয়। আর এরকম শব্দের ব্যবহার অন্য কারোর লেখায় পাওয়া যায় না। এখন একটা খুব পরিচিত কবিতায় হাটের বর্ণনার দিকে চোখ রাখি তাহলে বোঝা যায় কি সুন্দর ও নিখুঁতভাবে একটা গ্রামীণ হাটের বর্ণনা চিত্রিত করেছেন। সেই সাথে চিত্রিত করেছেন প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ ও হাটের অবস্থানটিকে। আবার সহজপাঠের অন্য এক পৃষ্ঠায় লিখেছেন সুস্থ পরিবেশকে কিভাবে টিকিয়ে রাখা যায়। এবং তার জন্য যৌথ প্রয়োগের কথাও বলেছেন। যেমন – আজ মঙ্গলবার। পাড়ার জঙ্গল সাফ করবার দিন। সব ছেলেরা দঙ্গলবেঁধে যাবে।

আবার সহজপাঠের-চতুর্থ পাঠের গদ্যাংশে আতিথিয়তার কথা উল্লেখ পাই। যেমন চন্দননগর থেকে আনন্দবাবু আসলেন। তিনি আমার পাড়ার কাজ দেখতে চান। দেখো, যেন নিন্দা না হয়। ইন্দুকে বলে দিয়ো, তাঁর আতিথ্যে যেন খুঁত না থাকে। তাঁর ঘরে সুন্দর দেখে ফুলদানি রেখে। ......... গ্রামের প্রাকৃতিক শোভা যে কত মধুর ও হৃদয়স্পর্শী তা দশমপাঠে কবিতায় সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কয়েকটি পংক্তিতে।

বাঁশ- বাগানের মাথায় মাথায়

তেঁতুল গাছের পাতায় পাতায়

হাসায় খিলি খিলি।

হঠাৎ কীসের মন্ত্র এসে

ভুলিয়ে দিলে এক নিমেষে

বাদল- বেলার কথা।

আবার একাদশ অধ্যায়ে লিখেছেন এক গভীর জঙ্গলে বাঘ শিকারকে কেন্দ্র করে একদিনের সফর কাহিনী। এই গল্পের মধ্যে তুলে ধরেছেন নদী, নৌকা, মন্দির, খাওয়া দাওয়া, ঘোর অন্ধকারে বাঘের ভয়ে গাছে চড়ে রাত কাটানো, বাঘের দেখা পাওয়া, কাঠুরিয়ার আতিথিয়তা ও মানবিকতাবোধ। এসব মিলিয়ে এক রোমাঞ্চকর ব্যাপার স্যাপার। যা শিশুদের কচিমনের গভীরে রেখাপাত করে।

শিশুতোষ কবি রবীন্দ্রনাথ সহজপাঠে স্বপ্ন দেখার কথা উল্লেখ করেছেন। এখানে শহর কলকাতার পথঘাট, ট্রামগাডি, দোকানপাঠ, হাওড়া ব্রিজের কথা উল্লেখ করেছেন। শুধু তাই নয়, এই শহরের নানান স্থাপত্যর কথাও বলেছেন। শিশুদের যে পড়ার উপকরণ সামগ্রীকে স্বপ্নের মধ্যে কেমন দেখেছেন তার উল্লেখ করেছেন সাহিত্য রস দিয়ে। এই কবিতার শেষ দুই লাইন আরও বেশি মজার। তাহল –

কীসের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল যেই-

দেখি, কলিকাতা আছে কলিকাতাতেই।

সহজপাঠে দ্বাদশ পাঠে কবি উল্লেখ করেছেন লোকযান পালকিতে ডাক্তারের যাত্রাপথের নানা ঘটনা। যার মধ্যে জঙ্গলে ভল্লুক ও নদীতে কুমিরকে নিয়ে যে ঘটনা তা শিশু মনে যেমন আলোড়ন সৃষ্টি করে। সন্ধ্যায় রাস্তায় দেখা রাখাল বালক। অনেকটা পথ মাঠ পেরিয়ে শ্মশান। পালকি ভেঙে পড়া ও পরে ডাকাতদের সঙ্গে লড়াই-এর যে লোমহর্ষক গল্প তা সত্যিকারের শিশুদের চোখে মুখে ফুটে ওঠে তাদের অন্তরগ্রাহীতার বহিপ্রকাশ। আবার একটিছোট্ট কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন বাঙালীর দুর্গোৎসব ঠিক পূর্বেদূর-দুরান্ত এলাকা থেকে বাড়ি ফেরার দৃশ্য স্টিমার ঘাটে। এই কবিতার ছবির মত নিখুঁত দৃশ্যর কথা সাবলিলভাবে ছোটদের সামনে তুলে ধরেছেন। সেখানে বাদ পড়েনি চিনের নতুন জুতোর কসমস শব্দও। নদীরতীরে অন্ধবেনি বসে হাঁড়ি বাজিয়ে গানগাওয়ার দৃশ্যসহ অন্যান্য ছোট-খাট দৃশ্যের কথা অতি যত্নে তুলে ধরার জন্য কবিতাটির অন্যমাত্রা পেয়েছে। যেমন-

চলিল গোরুর গাড়ি, চলে পালকি ডুলি,

শ্যাকরা-গাড়ির ঘোড়া উড়াইল ধূলি।

সহজপাঠে পৃষ্ঠায় বাদ পড়েনি সমাজে দরিদ্র মানুষের সামাজিক দায়ভার ও কর্তব্যের কথা। এই দায়ভার অর্থাৎ কন্যার বিয়েকে নিয়ে। অভাবের তাড়নায় চুরি করতে গিয়ে অত্যাচারী জমিদারের কাছে লাঞ্ছনার শিকারের কথাও। যা শিশুমনে গভীরভাবে দাগ কাটে সমাজের চালচ্চিত্র ও ধনী দরিদ্রের বর্ণ বৈষম্যের কথা। সহজপাঠ- দ্বিতীয় ভাগের শেষ কবিতায়রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ণনা করেছেন এক নদীর তীরে হাট ও তার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনার কথা। এর প্রতিটি লাইনে এক একটি পৃথক পৃথক দৃশ্যের কথা ভেসে ওঠে। যা বোধহয় আর কোনভাবেই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যেমন –

অঞ্জনা- নদী-তীরে চন্দনীগাঁয়ে

পোড়ো মন্দিরখানা গঞ্জেরবাঁয়ে
জীর্ণ ফাটল- ধরা – এক কোনে তারি

অন্ধ নিয়েছে বাসা কুঞ্জবিহারী।

এই কবিতায় কত মানুষের জীবন-জীবিকা ও নানারকমের প্রতিবন্ধকতার কথা বলা হয়েছে। এখানে সমাজের নানান দিক নিখুঁত ভাবে তুলেধরেছেন।রবীন্দ্রনাথ অন্ধ কুঞ্জবিহারীর দিনযাপনের কথা বলতে গিয়ে তার চারপাশের সমস্ত ব্যাপারটা তুলে ধরেছেন। সহানুভূতিশীল জমিদার সঞ্জয় সেন এর সম্পর্কেও বলেছেন।



শেষের কথা

রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সুদূর প্রসারিত ভাবনা যে কি বিশাল মাপের তা ছোটবেলাকার পড়াশুনায়সঠিকবোঝা সম্ভব নয়। পরিণত বয়সে পুনঃপাঠ যেন এক নতুন আবিষ্কারের মত। সহজপাঠ (প্রথম ভাগ) ছড়া- সহযোগে বর্ণমালা চেনানোর যেমন প্রয়াস, আবার অন্যদিকে তার প্রয়াস গ্রামীণ জীবনের সাথেশিশুদেরকে পরিচয় ঘটানো অর্থাৎ বলা যায় প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশকে চিনতে শেখা। তাইতো তিনি প্রকৃতির খারাপ দিক যেমন দেখিয়েছেন, আবার তেমনি সমাজের অন্যদিকে অসহায়, দীন-দরিদ্র মানুষের কথাও বলেছেন। বিভিন্ন বর্ণনায় ধরা পড়েছে চূড়ান্ত বাস্তব। অর্থাৎ শিশুদেরকে আলো-অন্ধকার,ভালো-খারাপ এই দুইকে তুলে ধরেছেন শিশু সাহিত্যের ভাব ও ভাষার মাধ্যমে। শিশুর অনুভব ও উপলব্ধির দ্বারা তাদের শৈশবের দরজা-জানলা খুলে দিয়েছেন। তিনি যদি কেবল প্রকৃতির বর্ণনা মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতেন, তাহলে বোধহয় গ্রামীণ জীবনের যথার্থ ছবি শিশুদের কাছে ঐ বয়সে অজানা থেকে যেত। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ সহজ পাঠে বাস্তবকে তুলে ধরে এক দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রকৃতি ও মানুষদের মেলবন্ধন তাঁর লেখায় বিশেষ স্থান পেয়েছে। সহজপাঠ স্থান পেয়েছে বড়োদের স্মৃতিতে। এখনও হৃদয়ের গভীরেগেঁথে রয়েছে সহজপাঠের এইসব পংক্তি। সহজ সরল মাধুর্‌যময় সহজপাঠ আজও আমাদেরকে অভিভূত করে রাখে এর ভাষা, ছন্দ, ভাব ও বক্তব্যের বিষয়বস্তু দিয়ে। এর পূর্ণপাঠ মুগ্ধতা শুধু নয়, এ এক অনবদ্য ও অপরূপ সৃষ্টি। যাকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান আমাদের বিস্ময়। রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘদিন নিরলস ভাবনা ও পরিণত বয়সের লেখনীর শব্দ-তুলিতে লেখা শিশুদের সহজপাঠ আজও আমাদের কাছে মণি-মুক্তোর চেয়েও বেশি দামী। নামটি যদিও ‘সহজপাঠ’ কিন্তু লেখা কাজটি ঠিক ততটাই কঠিন। পরিণত বয়স ও অভিজ্ঞতা দুইই ভীষণভাবে সহযোগিতা করেছে এইরূপ লেখা লিখতে। অনেক বৃহত্তর বিষয়কে সহজভাবে প্রকাশ করেছেন সহজপাঠের প্রতিটি পাতায়- কবিতায়, গদ্যে ও চিত্রশিল্পী নন্দলালের তুলির টানে। এই অতুলনীয় সৃষ্টি আমাদের কাছে চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে শিশুদের বর্ণশিক্ষার উদ্দেশ্যকে অক্ষরে অক্ষরে মিটিয়ে দিয়ে বিষয় ও ছন্দের বৈচিত্রে মিলের অপূর্বতায়, সরল সহজ মাধুর্যময়পাঠ এর মাধ্যমে।



গ্রন্থপঞ্জী

চক্রবর্তী, বরুণকুমার২০১১অন্য রবীন্দ্রনাথ নানা রবীন্দ্রনাথ, সম্পাদিত,পুস্তক বিপণি, কলকাতা। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১০ সার্ধশতবর্ষ- রবীন্দ্র স্মরণ সংখ্যা, সম্পাদিত, পশ্চিমবঙ্গ, তথ্য ও সংস্কৃতিবিভাগ, কলকাতা।

ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ-২০০৪, সহজপাঠ-প্রথম ভাগ, পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যালয়-শিক্ষা অধিকার, কলকাতা।

ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ-২০০৪, সহজপাঠ-দ্বিতীয় ভাগ, পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যালয় শিক্ষা-অধিকার, কলকাতা।

No comments:

Post a Comment