অমিত বনিক, জলপাইগুড়ি, সংবাদ একলব্য: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে এবার নিজেদের পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী অস্ত্রকেই আবার শান দিচ্ছে বামফ্রন্ট। গণনাট্য সংঘের উদ্যোগে জোরকদমে চলছে গণসঙ্গীতের প্রশিক্ষণ। আর সেই গানকে সঙ্গী করেই জলপাইগুড়ির বিভিন্ন প্রান্তে প্রচারের ময়দানে নেমে পড়েছেন বাম প্রার্থীরা। খেটে খাওয়া মানুষের সমস্যা থেকে শুরু করে নিত্যদিনের জীবনের নানা সংকট, সামাজিক বৈষম্য এবং পরিবর্তনের দাবি—সবকিছুই উঠে আসছে এই গণসঙ্গীতের কথায় ও সুরে।
নতুন গানের পাশাপাশি পুরনো সুরের আবেদন
ভারতীয় গণনাট্য সংঘের তরফ থেকে এবারের নির্বাচনী লড়াইয়ের জন্য লোকগীতির আঙ্গিকে বেশ কয়েকটি নতুন গান তৈরি করা হয়েছে। হুগলি জেলা সম্পাদক শুভজিৎ ধরের লেখায় এবং সুপর্ণা দাশগুপ্তের সুরে তৈরি হয়েছে একটি বিশেষ গান। এর পাশাপাশি সদর শাখার প্রবীণ সাথী হিতেশ চক্রবর্তীর লেখা গানও প্রচারের অঙ্গ হিসেবে পরিবেশন করা হচ্ছে। তবে নতুন গান তৈরি হলেও, পুরনো দিনের সেই বিখ্যাত গণসঙ্গীতগুলোর আবেদন এখনও অমলিন বলে দাবি করেছেন শিল্পীরা।
গণনাট্য সংঘের জলপাইগুড়ি জেলা সম্পাদিকা সুপর্ণা দাশগুপ্ত এ প্রসঙ্গে বলেন, "সলিল চৌধুরীর গান, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান—এগুলোর কি কখনও মৃত্যু হয়? এগুলোর কখনও মৃত্যু নেই। তবে হ্যাঁ, এখন অনেক পুরনো গানের রিমেক হচ্ছে। আমরাও সেই পুরনো সুরগুলোকে সম্বল করেই মানুষের কাছে আমাদের কথা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।"
নতুন প্রজন্মের অনীহা ও প্রবীণদের লড়াই
চল্লিশের দশকে বাংলার বামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম শক্তি ছিল এই গণসঙ্গীত। তরুণদের কণ্ঠে প্রাণ পেত এর সুর ও ছন্দ। কিন্তু বর্তমান চিত্রটা কিছুটা আলাদা। ডিজিটাল বিনোদনের যুগে নতুন প্রজন্মের মধ্যে গণসঙ্গীতের সেই উন্মাদনা আর বিশেষ চোখে পড়ে না। ফলে এবারের নির্বাচনী প্রচারে গণসঙ্গীতের দলগুলিতে তরুণদের বদলে পঞ্চাশোর্ধ প্রবীণ শিল্পীদের ভিড়ই বেশি।
এ বিষয়ে সঙ্গীতশিল্পী বেবী রায় বর্মনের গলায় আক্ষেপের সুর শোনা গেল। তিনি বলেন, "ছোটবেলা থেকে আমরা এই গান গেয়ে বড় হয়েছি। কিন্তু এখন এই ধরনের গানে নতুন প্রজন্ম খুব একটা আগ্রহী হচ্ছে বলছে না। আমাদের তো কোনও ইন্সট্রুমেন্ট নেই, কোথাও হয়তো শুধুমাত্র একটা দোতারা বা পারকাশনের তালে তালেই আমরা গান গাইছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো বাণীর ওপর জোর দেওয়া, যাতে মানুষের কাছে আমাদের স্পষ্ট বার্তাটা পৌঁছায়।"
মাটির সুরেই মানুষের মন ছোঁয়ার চেষ্টা
আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের অভাব থাকলেও শিল্পীরা মাটির সুরকে হাতিয়ার করেই মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সুপর্ণা দাশগুপ্তের কথায়, "আমরা যখন গ্রামগঞ্জে প্রচারে যাই এবং এই গানগুলো গাই, তখন দেখি রাস্তা দিয়ে যাওয়া টোটোওয়ালা, সাইকেল আরোহী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই একটু দাঁড়িয়ে গানগুলো শুনছেন। এর থেকে বোঝা যায় যে মাটির সুরের একটা আলাদা আবেদন আছে, যা এখনও মানুষের মন ছুঁয়ে যায়।"
জলপাইগুড়ি জেলায় সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রেই প্রার্থী দিয়েছে বামেরা। দল বেঁধে গণসঙ্গীত পরিবেশন করে চলছে প্রচার। আগের সেই জোয়ার হয়তো আর নেই, তবুও কিছু কণ্ঠ এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, শুধু এই ঐতিহ্যটুকুকে বাঁচিয়ে রাখার আশায়।
জলপাইগুড়ি জেলার রাজনীতি এবং বিধানসভা নির্বাচনের সমস্ত ব্রেকিং আপডেট পেতে চোখ রাখুন সংবাদ একলব্য-তে: sangbadekalavya.in
সাংবাদিক - অমিত বনিক
জন্মসূত্রে জলপাইগুড়ির বাসিন্দা অমিত বনিক স্নাতক সম্পন্ন করার পর ২০১৫ সাল থেকে পেশাদার সাংবাদিকতার জগতে পা রাখেন। ২০২০ সাল থেকে তিনি 'সংবাদ একলব্য'-এর সাথে যুক্ত রয়েছেন। জলপাইগুড়ি শহর এবং এর আশেপাশের এলাকার তৃণমূল স্তরের খবর থেকে শুরু করে সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা অত্যন্ত নিষ্ঠা ও বস্তুনিষ্ঠতার সাথে তুলে ধরাই তাঁর প্রধান কাজ।
ইমেইল: editor@sangbadekalavya.in
0 মন্তব্যসমূহ