কলকাতা, সংবাদ একলব্য: পহেলা এপ্রিল বিশ্বব্যাপী পালিত হয় 'April Fools’ Day' বা বোকা বানানোর দিন। বছরের এই একটি দিন, যখন কাছের মানুষ বা বন্ধুদের নির্দোষভাবে বোকা বানিয়ে নির্মল আনন্দ উপভোগ করা যায়। এই প্রথা (Prank Day) একদিন বা দু'দিনের নয়, চলে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। আপনিও কি কখনও এই দিনে বোকা হয়েছেন? কমেন্ট বক্সে অবশ্যই জানাবেন। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, অন্য সব দিন থাকতে হঠাৎ ১ এপ্রিলকেই কেন অন্যকে বোকা বানানোর জন্য বেছে নেওয়া হলো? কীভাবে শুরু হয়েছিল এই অদ্ভুত প্রথাটি?
'April Fools’ Day' বা বোকামি দিবসের উৎপত্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা মুনির নানা মত এবং ঐতিহাসিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। তবে এর মধ্যে কোনটি একেবারে ধ্রুব সত্য, তা বলা দায়। আসুন, ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে এই মজার দিনটির উৎপত্তির সম্ভাব্য ও সবচেয়ে জনপ্রিয় কারণগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
১. ফ্রান্সের ক্যালেন্ডার বদল এবং 'এপ্রিল ফিশ' (Poisson d’Avril)
এপ্রিল ফুলের উৎপত্তির সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বিশ্বাসযোগ্য তত্ত্বটি হলো ফ্রান্সের ক্যালেন্ডার পরিবর্তন। ১৫৮২ সালের দিকে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের বদলে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালুর নির্দেশ দেন (যদিও ১৫৬৪ সালেই ফ্রান্সে বছর শুরুর সময় পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল)।
এই পরিবর্তনের আগে, নববর্ষ পালিত হতো মার্চ মাসের শেষের দিকে (২৫ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত)। কিন্তু নতুন ক্যালেন্ডারে বছর শুরু হয় ১ জানুয়ারি থেকে। সেই যুগে খবর খুব ধীরে পৌঁছত। ফলে নতুন এই পরিবর্তনের কথা অনেকেই জানতে পারেননি, বা জানলেও পুরনো প্রথা ভেঙে তা মানতে চাননি। তাঁরা ১ এপ্রিলেই নববর্ষ উদযাপন চালিয়ে যান। যাঁরা নতুন ক্যালেন্ডার গ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা এই রক্ষণশীলদের নিয়ে মজা করতে শুরু করেন। বোকামি করে ১ এপ্রিলে নববর্ষ পালনকারীদের পিঠে কাগজের তৈরি মাছ (Paper Fish) লাগিয়ে দেওয়া হতো এবং তাঁদের বলা হতো 'Poisson d’Avril' বা 'এপ্রিল ফিশ'। মাছ যেমন সহজে টোপ গেলে, এদেরকেও তেমনই সহজে বোকা বানানো যায়— এটাই ছিল এর মূল তাৎপর্য। ফ্রান্সে এখনও এই প্রথা প্রচলিত।
২. প্রাচীন রোমের হিলারিয়া উৎসব ও পৌরাণিক কাহিনি
রোমানদের একটি প্রাচীন উৎসব 'হিলারিয়া' (Hilaria)-র সাথেও এর মিল পাওয়া যায়। মার্চ মাসের শেষের দিকে রোমানরা ছদ্মবেশ ধারণ করে একে অপরকে, এমনকি বিচারকদেরও বোকা বানাতেন। এর পাশাপাশি রয়েছে রোমান পুরাণের এক মজার গল্প। মৃত্যু ও পাতাললোকের দেবতা প্লুটো যখন দেবী পারসিফনকে অপহরণ করে নিয়ে যান, তখন পারসিফনের মা (কৃষিকাজের দেবী সেরিস) মেয়ের খোঁজে পাগলপ্রায় হয়ে যান। তিনি পাতাল থেকে মেয়ের গলার আওয়াজ শুনতে পেলেও, বোকার মতো চারদিক খুঁজতে থাকেন। সেরিসের এই বৃথা খোঁজাখুঁজি ও বোকামিকে স্মরণ করেই ১ এপ্রিল বোকামি দিবস পালন শুরু হয় বলে অনেকের বিশ্বাস।
৩. প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা
অনেকে আবার এই দিনটিকে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সাথেও যুক্ত করেন। উত্তর গোলার্ধে এই সময়ে শীতের শেষে বসন্তের আগমন ঘটে (Vernal Equinox)। এই সময় আবহাওয়া খুব খামখেয়ালি হয়। কখনো রোদ, কখনো হঠাৎ বৃষ্টি। মনে করা হয়, প্রকৃতি তার এই খামখেয়ালিপনার মাধ্যমে মানুষকে 'বোকা' বানায়। আর সেই থেকেই এপ্রিল ফুল প্রথার জন্ম।
৪. চসারের 'ক্যান্টারবেরি টেলস'
১৩৯২ সালে লেখা জিওফ্রে চসারের বিখ্যাত বই 'দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস' (The Canterbury Tales)-এও এপ্রিল ফুলের একটি অস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর একটি গল্পে লেখা হয়েছিল "মার্চ মাস শুরুর ৩২ দিন পর", যা আদতে ১ এপ্রিলকে বোঝায়। গল্পটিতে একটি শেয়ালের হাতে একটি মোরগের বোকা হওয়ার কাহিনি বর্ণিত ছিল। সাহিত্যের ইতিহাসে এটিকেই অনেকে এপ্রিল ফুলের প্রথম লিখিত উল্লেখ বলে দাবি করেন।
৫. স্কটল্যান্ডের 'গাউকি ডে' (Gowkie Day)
স্কটল্যান্ডে এই বোকা বানানোর প্রথাটি দু'দিন ধরে পালিত হয়। প্রথম দিনটিকে বলা হয় 'গাউকি ডে' (গাউক বা ককিল হলো বোকা মানুষের প্রতীক)। এই দিনে মানুষকে মিথ্যে কাজে বা ভুল ঠিকানায় পাঠানো হয়। আর এর পরের দিনটি হলো 'টেইলি ডে' (Tailie Day), যেখানে মানুষের অজান্তে তাদের পিঠে "কিক মি" (Kick Me) বা কোনো মজার লেজ লাগিয়ে দেওয়া হয়।
কারণ বা ইতিহাস যাই হোক না কেন, বর্তমান যুগে আধুনিক ইন্টারনেট এবং সংবাদমাধ্যমগুলোও এই দিনে সাধারণ মানুষকে বোকা বানাতে পিছপা হয় না। ১৯৫৭ সালে বিবিসির বিখ্যাত 'স্প্যাগেটি ট্রি' (গাছে নুডলস ফলছে) প্র্যাঙ্ক এর অন্যতম উদাহরণ। বাঙালিরাও কিন্তু এই দিনটিকে একটু মজার ছলেই পালন করতে ভালোবাসে। দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে এই দিনটির জুড়ি মেলা ভার। তবে আজ সাবধান! চোখ-কান খোলা রাখুন, নাহলে দেখবেন কোনো বন্ধুর পাল্লায় পড়ে আপনিও হয়তো আজ 'এপ্রিল ফুল' বা বোকা সেজে গেছেন!
দেশ-বিদেশের ইতিহাস, অজানা তথ্য এবং মজার সব খবরের আপডেট পেতে চোখ রাখুন সংবাদ একলব্য-তে: sangbadekalavya.in
Sangbad Ekalavya Digital Desk
প্রতিদিনের ব্রেকিং নিউজ থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি এবং স্থানীয় সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ খবর তুলে আনে সংবাদ একলব্য ডিজিটাল ডেস্ক। সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সঠিক তথ্যটি দ্রুততম সময়ে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করাই আমাদের এই এডিটোরিয়াল টিমের প্রধান উদ্দেশ্য। সত্য ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাই আমাদের মূলমন্ত্র।
ইমেইল: editor@sangbadekalavya.in
0 মন্তব্যসমূহ