ফুটপাতে বসে ২৭ বছরের অদম্য সাহিত্য সাধনা! ১০টি বইয়ের লেখক পিন্টু পোহান কেন ব্রাত্য ?
কলকাতা: জীবনযুদ্ধ কাকে বলে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে চোখ রাখতে হয় বেহালা চৌরাস্তার মদনমোহনতলার ফুটপাতে। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০২৬—টানা ২৭ বছর ধরে এই ফুটপাতে বসেই পান বিক্রি করছেন এক ব্যক্তি। পান বিক্রির ফাঁকে ফাঁকেই চলছে তাঁর নিরলস পড়াশোনা এবং সাহিত্যচর্চা। তিনি পিন্টু পোহান। চরম দারিদ্র্য, অবহেলা ও অবজ্ঞাকে সঙ্গী করে যিনি বাংলা সাহিত্যের জগতে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন। অথচ, আশ্চর্যের বিষয় হলো, যাঁর জীবনসংগ্রাম আজ হাজার হাজার মানুষের অনুপ্রেরণা, সেই পিন্টু পোহান আজও সরকারি সাহিত্য প্রতিষ্ঠানগুলির কাছে চরম ব্রাত্য!
কলকাতায় জন্ম নেওয়া পিন্টু পোহানের পিতা পূর্ণচন্দ্র পোহান এবং মাতা উজ্জ্বলা দেবী। অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরনোর দশা থাকলেও, পিন্টুর কলম বা পড়ার নেশা কোনোদিন থামেনি। প্রতিদিন ফুটপাতে বসে পান বিক্রি করার ফাঁকেই তিনি শেষ করেছেন দুই হাজারের বেশি বই। শুধু তাই নয়, এই ফুটপাতে বসেই শত প্রতিকূলতার মধ্যে পড়াশোনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যে স্নাতক (Bachelor Degree) এবং স্নাতকোত্তর (Master Degree) ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
ফুটপাতে বসে তিনি যা লিখেছেন, তা কোনো সাধারণ লেখা নয়। তাঁর সৃষ্টি জায়গা করে নিয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা, আনন্দমেলা, সানন্দা, দেশ, চিরসবুজ লেখা, নবকল্লোল, শুকতারা, বর্তমান, প্রতিদিন এবং সাপ্তাহিক বর্তমানের মতো বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির পত্রপত্রিকায়। ছোটদের জন্য তাঁর লেখা ৮টি গল্পের বই ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— 'ঠাকুর্দার আশ্চর্য গল্প', 'আনতা বুড়ি পানতা বুড়ি', 'দুঃখীরামপুরের দুঃখী মানুষেরা', 'পারুলমাসির ছাগলছানা', 'নোটন নোটন পায়রাগুলি', 'ইলিশখেকো ভূত', 'কচুরিপানার ভেলা' এবং 'ঝিনুককুমার'। বড়দের জন্য তিনি লিখেছেন 'তূণীর'। এছাড়া তাঁর ১২৪টি গল্পের সংকলন 'ভজগোবিন্দপুরের নতুন আগন্তুক এবং...' ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। সব মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১০।
পিন্টু পোহানের এই অভাবনীয় লড়াইয়ের কথা আড়াইশোর বেশি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর জীবনসংগ্রামের কথা সগর্বে উচ্চারিত হয়েছে কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিং এবং রাজস্থানের ক্যাবিনেট মন্ত্রী রাজ্যবর্ধন সিং রাঠোরের মুখে। রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তী থেকে শুরু করে বেহালার ১২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রূপক গাঙ্গুলী এবং অগণিত সামাজিক সংগঠন তাঁর এই ২৭ বছরের লড়াইকে স্বীকৃতি ও সম্মান জানিয়েছে।
যে মানুষটি দীর্ঘ ২৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফুটপাতে বসে দু'মুঠো ভাত জোগাড়ের পাশাপাশি নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, সাহিত্যচর্চাকে আগলে রেখেছেন, তিনি কি সমাজের গর্ব নন? ফুটপাতে বসে ২ হাজার বই পড়া, মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করা এবং প্রথম সারির পত্রিকায় লেখা প্রকাশ—এগুলো কি গর্বের বিষয় নয়?
অথচ আশ্চর্যের বিষয়, সরকার এবং সরকারের দ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন সাহিত্য সংস্থা ও আকাদেমিগুলি এই অসামান্য প্রতিভার প্রতি সম্পূর্ণ নীরব। যাঁর লড়াইয়ের গল্প সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তিনি আজ পর্যন্ত সরকারি পরিচালিত কোনো সাহিত্য আকাদেমিতে নিতান্ত একটি কবিতা পাঠের জন্যও আমন্ত্রণ পেলেন না! সমাজের চোখে যিনি 'অনুপ্রেরণার আর এক নাম', সেই পিন্টু পোহানকে এই প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা কি বাংলা সাহিত্যেরই এক চরম ব্যর্থতা নয়?
Sangbad Ekalavya Digital Desk
প্রতিদিনের ব্রেকিং নিউজ থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি এবং স্থানীয় সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ খবর তুলে আনে সংবাদ একলব্য ডিজিটাল ডেস্ক। সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সঠিক তথ্যটি দ্রুততম সময়ে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করাই আমাদের এই এডিটোরিয়াল টিমের প্রধান উদ্দেশ্য। সত্য ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাই আমাদের মূলমন্ত্র।।
ইমেইল: editor@sangbadekalavya.in

0 মন্তব্যসমূহ
Thank you so much for your kindness and support. Your generosity means the world to me. 😊