বড় রায় সুপ্রিম কোর্টের ! কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে রাজ্য পুলিশের লাগবে না কোন অনুমতি
নয়াদিল্লি: কেন্দ্র বনাম রাজ্য সংঘাতের আবহে এক নজিরবিহীন রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল (Supreme Court Judgment), কোনও কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী (Central Govt Employees Investigation) যদি রাজ্যের সীমানার মধ্যে দুর্নীতি বা অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হন, তবে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করার পূর্ণ অধিকার রাজ্য পুলিশের রয়েছে। এর জন্য কেন্দ্রের বা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় দপ্তরের আগাম অনুমতির কোনও প্রয়োজন নেই।
বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার বেঞ্চের এই রায় ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যগুলির ক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে তথ্যাভিজ্ঞ মহল।
এই ঐতিহাসিক রায়ের নেপথ্যে রয়েছে রাজস্থানের একটি দুর্নীতির মামলা (Corruption Case)। রাজস্থানে কর্মরত কেন্দ্রীয় সরকারের এক আধিকারিক, নবল কিশোর মীনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, তিনি রাজস্থানে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের কাজ চলাকালীন অনিয়ম করেছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে রাজস্থান পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে এবং তদন্ত শেষে চার্জশিট পেশ করে।
অভিযুক্ত আধিকারিক সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে যুক্তি দেন যে, তিনি যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী, তাই রাজ্য পুলিশ বা রাজ্যের দুর্নীতি দমন শাখার (ACB) তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করার এক্তিয়ার নেই। তাঁর দাবি ছিল, একমাত্র সিবিআই বা কেন্দ্রীয় এজেন্সিরই এই তদন্ত করার অধিকার রয়েছে এবং তার জন্য কেন্দ্রের অনুমতির প্রয়োজন। এর আগে রাজস্থান হাইকোর্টও তাঁর এই যুক্তি খারিজ করে দিয়েছিল।
রাজস্থান হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে:
১. অপরাধ বা দুর্নীতি যেখানে সংঘটিত হচ্ছে, সেই এলাকাটি যে রাজ্যের অন্তর্গত, সেই রাজ্যের পুলিশের তদন্ত করার প্রাথমিক অধিকার রয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি কার অধীনে চাকরি করেন (কেন্দ্র না রাজ্য), তা এক্ষেত্রে বিচার্য নয়।
২. রাজ্য পুলিশ বা রাজ্যের তদন্তকারী সংস্থা যদি মনে করে দুর্নীতির যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে, তবে তারা সরাসরি মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করতে পারে এবং আদালতে চার্জশিট জমা দিতে পারে। এর জন্য কেন্দ্রের 'অনুমতি' (Sanction) নেওয়ার বিষয়টি তদন্ত শুরু করার ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে না।
৩. আদালত পুরনো একাধিক রায়ের উল্লেখ করে জানিয়েছে, 'পুলিশ' এবং 'আইনশৃঙ্খলা' রাজ্যের তালিকাভুক্ত (State List) বিষয়। তাই রাজ্যের সীমানায় আইন লঙ্ঘিত হলে রাজ্য পুলিশ হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না।
বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই রায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরালা এবং দিল্লির মতো অবিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি অভিযোগ করে আসছে যে, কেন্দ্রীয় সরকার ইডি (ED) এবং সিবিআই (CBI)-কে ব্যবহার করে বিরোধীদের হেনস্তা করছে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় রাজ্যগুলির হাতেও পাল্টা আইনি 'অস্ত্র' তুলে দিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।এতদিন অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীরা মনে করতেন যে রাজ্য পুলিশের আওতার বাইরে তাঁরা একপ্রকার 'সুরক্ষিত'। এই রায়ের ফলে সেই ধারণা ভাঙল। এখন থেকে রাজ্যের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে রাজ্য পুলিশ সরাসরি পদক্ষেপ নিতে পারবে।
সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ। এর ফলে দুর্নীতির তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা কমবে এবং কেন্দ্র বা রাজ্যের দোহাই দিয়ে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়া কঠিন হবে। তবে রাজনীতির কারবারিরা মনে করছেন, এর ফলে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আইনি লড়াই ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।

0 মন্তব্যসমূহ
Thank you so much for your kindness and support. Your generosity means the world to me. 😊