নদিয়ার শান্তিপুরের জজ পণ্ডিত বাড়ির দুর্গাপুজোয় আজও কথা বলে ঐতিহ্য
ইতিমধ্যেই অতিক্রান্ত হয়েছে সাড়ে চারশো বছর। সময়ের সাথে সাথে হারিয়েছে জমিদারির স্বর্ণযুগ। কিন্তু নদিয়ার শান্তিপুরের তর্কবাগীশ লেনের জজ পণ্ডিত বাড়ির মাতৃ আরাধনায় আজও শেষ কথা বলে চলেছে চলে আসা প্রথা এবং নিষ্ঠা।
জজ পণ্ডিত বাড়ির এই দুর্গা পুজোর আয়োজক চট্টোপাধ্যায় পরিবার। আদতে চৈতল মাহেশের বংশধর এই চট্টোপাধ্যায় পরিবারের বিহারের গয়ার যদুয়াতে একসময় বিরাট জমিদারি ছিল। এই পরিবারেরই সন্তান পীতাম্বর চট্টোপাধ্যায় ব্রিটিশ আমলে তর্কবাগীশ উপাধিতে ভূষিত হন।
গয়ায় জমিদারি পরিচালনার কালে প্রজাদের নানান সমস্যার বিচার করতেন এই শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত। এই কারণেই তিনি জজ পণ্ডিত উপাধি লাভ করেন। পরে এই পরিবার কোনও এক অজ্ঞাত কারণে বসবাসের জন্য শান্তিপুরে চলে আসেন। শান্তিপুরে নতুন জমিদারি পত্তনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় দেবীর আরাধনা। শোনা যায় আগেই তাঁদের জমিদারিতে দেবীর আরাধনা হতো। তবে এখানে দেবীর আরাধনা শুরু হয় নতুন করে। দেবীর পুজোর জন্য সেই সময়ে নির্মিত হয়েছিল যে পাঁচখিলান বিশিষ্ট দালান - আজও দেবী দুর্গার আরাধনা সেখানেই হয়।
রথের দিন পাটে সিঁদুর দেওয়া হয়। বাড়ির সধবারা রথের দিনই সিঁদুর খেলেন। দেবী এখানে পূজিত হন মহিষাসুরমর্দিনী রূপে। এখানে এক চালার প্রতিমায় অনুপস্থিত লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ। রথের দিন সিঁদুর খেলা এবং দেবীর একলা উপস্থিতি এ পুজোর বড়ো বিশেষত্ব।
এখানে দেবীর পুজো হয় শাক্ত মতে। পুজোর ভোগে থাকে সপ্তমীতে নিরামিষ, অষ্টমীর দিন ইলিশ মাছ, নবমীর দিন কচুর শাকসহ ১৭ রকমের ভোগ। একসময় নবমীতে ১০৮ টা মোষ বলি ও ২৮ টা পাঁঠা বলি হত। তবে এখন কুমড়ো বলি হয়। দশমীর দিন মায়ের ভোগে থাকে পান্তা ভাত। সঙ্গে কচুর শাক এবং কাঁচকলার বড়া।
বাইরের পুরোহিতরা নন, বংশ পরম্পরায় এই বাড়ির সদস্যরাই পুজোতে পৌরোহিত্য করেন। পুজোর বোধন হয় ঠাকুরবাড়ি সংলগ্ন পঞ্চবটির নির্দিষ্ট আসনে। মায়ের অবস্থান ক্ষেত্রের নিচে আছে পঞ্চমুণ্ডির আসন। দেবী দুর্গার পুজোয় এই পঞ্চবটি এবং পঞ্চমুণ্ডির একত্র সংযোগও এই পুজোর আর এক বড়ো বৈশিষ্ট্য।
একসময় নবমীতে নাট মন্দিরের মাঠে কর্দমাক্ত উৎসব পালন করা হতো। বাইরে থেকে তখন ছেলেরা আসত ডগর বাজাতে বাজাতে। আর ছিল ফানুস। ফানুসের আলোয় হতো দেবী দুর্গার আরাধনা।
এই জজ পণ্ডিত বাড়ির কন্যা নির্মলা দেবীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন শোক কাব্য 'অশ্রু'-র কবি ভোলানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর প্রপৌত্র ড. শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আমি শুনেছি ভোলানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্রে এই বাড়ির দুর্গাপুজো এবং কালী পুজোতে এসেছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে তার সঠিক সাল তারিখ জানা নেই।
সময়ের সাথে সাথে আজ অনেক কিছুই হারিয়ে গিয়েছে, এই পুজো থেকে। তবু আয়োজনে আজও প্রয়াস রয়েছে সাধ্যমতো। জজ পণ্ডিত বাড়ির পক্ষ থেকে এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ড. সঞ্চারী চট্টোপাধ্যায় বলেন, এই বাড়ির দুর্গাপুজোতে নিয়ম নিষ্ঠা শেষ কথা বলে। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম মানা হয়। বজায় রাখা হয় ঐতিহ্য। আর এসব কিছুর মধ্যে দিয়েই আজও এখানে পূজিত হচ্ছেন দেবী।

0 মন্তব্যসমূহ
Thank you so much for your kindness and support. Your generosity means the world to me. 😊