মমতার হাতছাড়া পরিষদীয় দল! বিধানসভায় ৬০ বিধায়কের সমর্থনে নতুন বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা: রাজ্য রাজনীতিতে বেনজির পটপরিবর্তন! তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে চলা বিদ্রোহ এবার চূড়ান্ত রূপ নিল বিধানসভার অন্দরে। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতছাড়া হয়ে গেল পরিষদীয় দল। সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮০ জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে সিংহভাগ বিধায়কের সমর্থন আদায় করে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নতুন বিরোধী দলনেতা (Leader of the Opposition) হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
বুধবার বিধানসভায় স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থনের চিঠি তুলে দেয় বিদ্রোহী শিবির। এরপরই স্পিকারের নির্দেশ অনুযায়ী নতুন বিরোধী দলনেতার জন্য নির্ধারিত ঘরের চাবি ঋতব্রতের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
বিধায়কদের সমর্থন ও সমীকরণ
বিধানসভায় বিরোধী দলের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ নিতে এবং দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে বিদ্রোহী শিবিরের প্রয়োজন ছিল দলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়কের সমর্থন। সেই অঙ্কে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মোট ৬০ জন বিধায়ক। সমর্থনের বিষয়টি নিশ্চিত করে ঋতব্রত জানান, "আপাতত ৫৮ জন বিধায়ক সশরীরে উপস্থিত থেকে সম্মতি জানিয়েছেন। আরও দু'জন বিধায়ক বর্তমানে রাজ্যের বাইরে আছেন, তবে তাঁদের পূর্ণ সমর্থন আমাদের সঙ্গে রয়েছে। তাঁদের সমর্থন এসে পৌঁছলেই এই সংখ্যাটি ৬০-এ দাঁড়াবে।"
নতুন পরিষদীয় দলের রদবদল
বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব পাওয়ার পরেই বিধানসভায় দলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদগুলির ঘোষণা করেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। এই পদাধিকারীদের তালিকা স্পিকারের কাছেও জমা দেওয়া হয়েছে:
- মুখ্য সচেতক (Chief Whip): আখরুজ্জামান।
- উপ-দলনেতা (Deputy Leaders): চারজনকে উপ-দলনেতা বা ডেপুটি লিডার হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। এঁরা হলেন— জাভেদ আহমেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন, শিউলি সাহা এবং সন্দীপন সাহা।
'নব তৃণমূল'-এর প্রধান দাবি ও অবস্থান
বিধানসভার অলিন্দে দাঁড়িয়ে ৬০ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেদের রাজনৈতিক রূপরেখা স্পষ্ট করেছেন। তাঁদের প্রধান দাবিগুলি হলো:
- নিশানায় অভিষেক: বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দাবি, দলের বর্তমান ডামাডোল, অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং নিচুতলার কর্মীদের ক্ষোভের জন্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ নেতারাই দায়ী। পুরোনো ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। তাই দলকে সঠিক পথে ফেরাতে অভিষেককে দল থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছেন তাঁরা।
- মমতাই নেত্রী: এই বিদ্রোহের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, বিক্ষুব্ধ বিধায়করা দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এক বিন্দুও সরব হননি। তাঁদের স্পষ্ট বার্তা, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই আমাদের একমাত্র নেত্রী।" তাঁকে সুপ্রিমো হিসেবে মেনেই এই 'নব তৃণমূল' পথ চলবে এবং তাঁরাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আসল আদর্শের বাহক।
- আসল তৃণমূলের স্বীকৃতি: অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁদের 'দূর-দূরান্তের সম্পর্ক নেই' বলে মন্তব্য করে বিদ্রোহী গোষ্ঠী প্রমাণ করতে চাইছে যে, বর্তমান নেতৃত্বের একাংশের প্রতি অনাস্থা থাকলেও, তাঁরাই প্রকৃত 'আসল তৃণমূল'।
তৃণমূলের অন্দরে চরম সংকট
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, 'নব তৃণমূল'-এর এই চাঞ্চল্যকর অবস্থান তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের দীর্ঘদিনের 'নবীন বনাম প্রবীণ' দ্বন্দ্বেরই চূড়ান্ত এবং চরমতম বিস্ফোরণ। দলের যে সমস্ত পুরোনো নেতা ও বিধায়করা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যপ্রণালী এবং নতুন প্রজন্মের নেতাদের একচেটিয়া উত্থানে অসন্তুষ্ট ছিলেন, তাঁরাই এখন একজোট হয়ে এই ধাক্কা দিয়েছেন।
এই ঘটনা দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সংকট তৈরি করেছে। একদিকে তাঁর ভাইপো ও দলের শীর্ষ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্যদিকে দলের অন্তত ৬০ জন গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহী বিধায়ক—যাঁরা মমতাকেই নেত্রী মানছেন অথচ অভিষেককে মানতে নারাজ। এই জোড়া ফলার চাপে তৃণমূল সুপ্রিমো এখন কী রণকৌশল নেন এবং বিধানসভায় এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির জল কতদূর গড়ায়, গোটা রাজ্যের নজর এখন সেদিকেই।
রাজ্য রাজনীতির সমস্ত মেগা ব্রেকিং আপডেট ও বিধানসভার ইনসাইড স্টোরি সবার আগে পেতে চোখ রাখুন সংবাদ একলব্য-তে
🌐 sangbadekalavya.inসংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ (Disclaimer): এই প্রতিবেদনটি বিধানসভার সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্রের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত পরিবর্তনশীল এবং এর পরবর্তী আইনি ও সাংবিধানিক পদক্ষেপ স্পিকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।