বর্ষার শুরুতেই ৩ মাসের জন্য বন্ধ ডুয়ার্সসহ রাজ্যের সব জঙ্গল!
নিজস্ব প্রতিনিধি, শিলিগুড়ি: উত্তরবঙ্গের পর্যটনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ডুয়ার্সসহ রাজ্যের সমস্ত অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যান আগামী তিন মাস পর্যটকদের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। প্রতি বছরের নিয়ম মেনে, ১৬ জুন থেকে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা তিন মাস বন্ধ থাকবে গরুমারা, জলদাপাড়া, বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প, নেওড়া ভ্যালি জাতীয় উদ্যান এবং চাপড়ামারির মতো সমস্ত বনাঞ্চল। এই তিন মাস জঙ্গলে সমস্ত ধরণের ওয়াচ টাওয়ার ভ্রমণ, জিপ সাফারি এবং হাতি সাফারি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
কেন এই তিন মাস বন্ধ থাকে জঙ্গল?
বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টিপাত, বন্যা, ভূমিধস, রাস্তার ক্ষতি এবং বনাঞ্চলে বন্যপ্রাণীদের আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যটকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। সেই দিককে মাথায় রেখেই প্রত্যেক বছরের ন্যায় এমন সিদ্ধান্ত বন দপ্তরের। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইন, ১৯৭২-এর ধারা ৩৩(সি) অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
১. বন্যপ্রাণীদের প্রজনন কাল (Breeding Season): বর্ষার এই সময়টি হাতি, গণ্ডার, বাঘ, হরিণ, বাইসনসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর প্রজনন কাল। এই সময় জঙ্গলে নতুন নতুন শাবকের জন্ম হয়। পর্যটকদের আনাগোনায় যাতে মা ও সদ্যোজাত বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় কোনও বিঘ্ন না ঘটায়, তার জন্যই জঙ্গলকে এই একপ্রকার “মাতৃত্বকালীন ছুটি” দেওয়া হয়।
২. পর্যটকদের নিরাপত্তা: বর্ষার মরসুমে বনারণ্যের ভেতরের কাঁচা রাস্তাগুলো অত্যন্ত কাদা এবং জলমগ্ন হয়ে পড়ে। ফলে সাফারি গাড়ি আটকে যাওয়ার বা উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়াও এই সময়ে জলমগ্ন নদী-নালা পার হতে গিয়ে বা আচমকা বন্যপ্রাণীর মুখোমুখি পড়ে বড়সড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতেই এই নিষেধাজ্ঞা।
৩. প্রকৃতির পুনর্জন্ম ও বিশ্রাম: সারা বছর হাজার হাজার পর্যটকের কোলাহলের পর এই তিন মাস জঙ্গল নিজের ক্ষত নিরাময় করে। মানুষের হস্তক্ষেপ না থাকায় এই সময়ে অরণ্যে নতুন ঘাস ও গাছপালা জন্মায়, জলাশয়গুলি ভরে ওঠে এবং প্রকৃতি তার নিজস্ব চেনা ছন্দ ফিরে পায়।
বন বাংলো বন্ধ থাকলেও খোলা থাকছে রুট রোড
বন দফতরের নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, এই তিন মাস জঙ্গলের ভেতরে থাকা সমস্ত সরকারি বন বাংলোর বুকিং বন্ধ থাকবে। তবে জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া মূল রাস্তাগুলি (রুট রোড) দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক যাতায়াতের ক্ষেত্রে কোনও নিষেধাজ্ঞা থাকছে না। শুধুমাত্র পর্যটকদের ভ্রমণের ওপরই এই নিষেধাজ্ঞা জারি থাকবে।
স্বাগত জানিয়েছে পরিবেশ প্রেমীরা
টানা তিন মাস ডুয়ার্সের জঙ্গল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই পর্যটন ব্যবসায়ী, হোমস্টে মালিক এবং গাইডদের কপালে কিছুটা চিন্তার ভাঁজ পড়লেও, প্রকৃতির স্বার্থে এই নিয়মকে স্বাগত জানিয়েছেন পরিবেশপ্রেমীরা। তাঁদের সাফ কথা, প্রকৃতিকে সত্যিকার ভালোবাসলে তার এই বিশ্রামের সময়টুকু আমাদের সম্মান করতেই হবে।
উত্তরবঙ্গের জঙ্গল সাফারি (FAQ)
প্রশ্ন: উত্তরবঙ্গের জঙ্গলগুলি কতদিনের জন্য বন্ধ থাকছে?
উত্তর: প্রতি বছরের মতো এবছরও ১৬ জুন থেকে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা তিন মাস উত্তরবঙ্গের সমস্ত জঙ্গল পর্যটকদের জন্য বন্ধ থাকছে।
প্রশ্ন: বর্ষাকালে জঙ্গল কেন বন্ধ রাখা হয়?
উত্তর: বর্ষার সময়টি মূলত বন্যপ্রাণীদের প্রজনন কাল। মা ও শাবকদের বিরক্ত না করা, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রকৃতিকে নিজের ক্ষত নিরাময়ের সুযোগ দেওয়ার জন্যই জঙ্গল বন্ধ রাখা হয়।
প্রশ্ন: এই সময়ে কি জঙ্গলের ভেতরের সমস্ত রাস্তা বন্ধ থাকবে?
উত্তর: না, জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে যাওয়া মূল রাস্তা বা রুট রোডগুলো স্থানীয়দের যাতায়াতের জন্য খোলা থাকবে। শুধুমাত্র সাফারি এবং পর্যটনমূলক কার্যকলাপ বন্ধ থাকবে।
© ২০২৬ সংবাদ একলব্য। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।