নিজস্ব প্রতিবেদন, সংবাদ একলব্য: গণতন্ত্রে সরকার আসে, সরকার যায়। ক্ষমতার পালাবদল এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের সন্ধিক্ষণে প্রশাসনিক স্তরে এমন কিছু পদক্ষেপ বা নির্দেশিকা জারি হয়, যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় প্রশাসন বা পূর্বতন সরকারের অন্দরে দুর্নীতির শিকড় ঠিক কতটা গভীরে পৌঁছেছিল। আজ, ৪ মে ২০২৬, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের দিন রাজ্যের মুখ্যসচিবের (Chief Secretary) দপ্তর থেকে জারি করা একটি নির্দেশিকা ঠিক সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিয়ালা (Dushyant Nariala) স্বাক্ষরিত এক অতীব জরুরি নির্দেশিকায় রাজ্যের সমস্ত দপ্তরের সচিব এবং বিভাগীয় প্রধানদের কড়া ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে— সরকারি অফিস থেকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফাইল বা নথিপত্র সরানো, নষ্ট করা বা বাইরে নিয়ে যাওয়া চলবে না। কিন্তু কেন ঠিক ফলপ্রকাশের দিনই এমন কড়া নির্দেশিকা?
কী বলা হয়েছে মুখ্যসচিবের নির্দেশিকায়?
৪ মে, ২০২৬ তারিখে জারি করা '95-CS/2026' মেমো নম্বরের এই নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলা হয়েছে:
- কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাগজ বা ফাইল অফিস থেকে সরানো বা নষ্ট করা যাবে না।
- কোনো ফাইলের আনঅথোরাইজড বা অননুমোদিত কপি (Copying) বা স্ক্যানিং (Scanning) করা যাবে না।
- সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের সঠিক হিসাব (Accounted for) রাখতে হবে।
- সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই নির্দেশিকা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার ব্যক্তিগত দায়িত্ব (Personal Responsibility) দেওয়া হয়েছে বিভাগীয় প্রধান এবং সচিবদের ওপর। এর কোনো রকম বিচ্যুতি ঘটলে তাঁরাই ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকবেন।
কেন এই নির্দেশিকা? দুর্নীতি লোপাটের চেষ্টা রুখতে?
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের মতে, এই নির্দেশিকা প্রমাণ করে প্রশাসন কতটা গভীরে দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল এবং ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কায় কীভাবে তথ্য লোপাটের চেষ্টা হতে পারে।
সাধারণত, যখন কোনো সরকারের বিরুদ্ধে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ থাকে এবং নির্বাচনে তাদের ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখন বিদায়ী সরকারের মন্ত্রী, নেতা বা তাঁদের ঘনিষ্ঠ আমলারা নিজেদের বাঁচানোর তাগিদে দুর্নীতির প্রমাণ থাকা ফাইল গায়েব করার বা পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে নিয়োগ দুর্নীতি, কয়লা, গরু পাচার বা বিভিন্ন টেন্ডার দুর্নীতির মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এই প্রবণতা প্রবল হয়। মুখ্যসচিবের এই 'স্ট্যাটাস কো' বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশিকা আসলে সেই 'ক্লিনআপ অপারেশন' বা প্রমাণ লোপাটের চেষ্টাকে রুখে দেওয়ার এক মরিয়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
অতীতে কি এমন নির্দেশিকা কোনো সরকারের আমলে জারি হয়েছে?
এই ধরনের লিখিত নির্দেশিকা বিরল হলেও, ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় প্রমাণ লোপাটের বা ফাইল নষ্ট করার ইতিহাস ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন নয়।
- ২০১১ সালের পালাবদল: পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের পতনের পর এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতাগ্রহণের ঠিক সন্ধিক্ষণে রাইটার্স বিল্ডিং (তৎকালীন রাজ্য সচিবালয়) থেকে বহু ফাইল গায়েব হওয়া, ছিঁড়ে ফেলা বা পুড়িয়ে ফেলার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছিল। তখন শোনা গিয়েছিল, পূর্বতন সরকারের বহু অস্বস্তিকর সিদ্ধান্ত বা বেনিয়মের প্রমাণ রাতারাতি নষ্ট করা হয়েছিল। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ফাইলের কথা বললেও কোনো জালিয়াতিই সামনে আনতে পারেননি।
- অন্যান্য রাজ্যে: শুধু বাংলা নয়, ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও এমনটা দেখা যায়। সরকার বদলের ইঙ্গিত পেলেই বিদায়ী মন্ত্রীদের দপ্তর থেকে পেপার শ্রেডার (Paper Shredder) মেশিনের মাধ্যমে বস্তা বস্তা কাগজ নষ্ট করার খবর বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
- কেন্দ্রীয় স্তরে: এমনকি ২০১৪ সালে কেন্দ্রে ইউপিএ (UPA) সরকারের বিদায় এবং এনডিএ (NDA) সরকারের আগমনের মধ্যবর্তী সময়েও বিভিন্ন মন্ত্রকে ফাইল সুরক্ষিত রাখার জন্য অলিখিত সতর্কতা জারি হয়েছিল।
তবে, মুখ্যসচিব পদমর্যাদার কোনো আধিকারিকের তরফ থেকে ফলপ্রকাশের দিনই এমন সুনির্দিষ্ট, লিখিত এবং 'ব্যক্তিগতভাবে দায়ী' (Personally liable) করার মতো নির্দেশিকা জারি হওয়া নিঃসন্দেহে নজিরবিহীন।
প্রশাসনিক কর্তারা বুঝতে পেরেছেন, ক্ষমতার হাতবদল হলে নতুন সরকার বা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলো পুরনো দুর্নীতির ফাইল তলব করবে। তখন যদি সেই ফাইল না পাওয়া যায়, তবে তার দায়ভার সরাসরি আমলাদের ঘাড়েই পড়বে, বিদায়ী নেতাদের নয়। তাই নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এবং রাজ্যের প্রশাসনিক নথিপত্র সুরক্ষিত রাখতেই আমলাতন্ত্র এই 'ঢাল' ব্যবহার করেছে। এই এক পাতার নির্দেশিকা আসলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, বিগত বছরগুলোতে দুর্নীতির জাল কতদূর বিস্তৃত হয়েছিল এবং তার প্রমাণ লোপাট হওয়ার ভয় কতটা প্রবল।
রাজ্য প্রশাসন এবং রাজনীতির সমস্ত গভীর বিশ্লেষণ ও লেটেস্ট খবরের আপডেট পেতে চোখ রাখুন সংবাদ একলব্য-তে: sangbadekalavya.in
Sangbad Ekalavya Digital Desk
প্রতিদিনের ব্রেকিং নিউজ থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি এবং স্থানীয় সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ খবর তুলে আনে সংবাদ একলব্য ডিজিটাল ডেস্ক। সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সঠিক তথ্যটি দ্রুততম সময়ে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করাই আমাদের এই এডিটোরিয়াল টিমের প্রধান উদ্দেশ্য। সত্য ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাই আমাদের মূলমন্ত্র।
ইমেইল: editor@sangbadekalavya.in
0 মন্তব্যসমূহ