সমীর হোসেন, দিনহাটা: বাংলা আবাস যোজনার ঘরের নাম করে গরিব মানুষের কাছ থেকে কাটমানি নেওয়ার অভিযোগে শনিবার দিনহাটায় তুমুল বিক্ষোভ দেখালেন সাধারণ মানুষ। শনিবার দুপুর ১টা নাগাদ দিনহাটার পুটিমারী ১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের জড়াবাড়ি এলাকায় অভিযুক্ত তৃণমূল উপপ্রধান প্রিয়ঙ্কর রায় বর্মনের বাড়িতে চড়াও হন ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা। কাটমানির টাকা ফেরতের দাবির পাশাপাশি ওই নেতার বিরুদ্ধে খাসজমি দখল এবং বালি মাফিয়া চক্র চালানোরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, আবাস যোজনার ঘর পাইয়ে দেওয়ার নাম করে মাথা পিছু ন্যূনতম ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কাটমানি তুলেছিলেন এই তৃণমূল নেতা। বিক্ষোভকারীদের দাবি, এই বিপুল অঙ্কের টাকা কাটমানি দেওয়ার ফলে ঘরের অর্ধেক কাজ হওয়ার পর আর মাথার ওপর চালটুকুও দিতে পারছেন না তাঁরা। এদিন গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়ে কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে, তার একটি দীর্ঘ তালিকা প্রস্তুত করে উপপ্রধানের বাড়ির সামনে হাজির হন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া যদু গোপাল বর্মন নামে এক ব্যক্তি চাঞ্চল্যকর হিসেব দিয়ে জানান, "জড়াবাড়ি মহেশের হাট এলাকা থেকে ৬ লক্ষ ৭৬ হাজার ৬০০ টাকা এবং গীতা ভবন এলাকা থেকে ৫ লক্ষ ৬৭ হাজার টাকা— অর্থাৎ শুধুমাত্র এই দুই এলাকা থেকেই মোট ১২ লক্ষ ৪৩ হাজার ৬০০ টাকা কাটমানি তুলেছিল প্রিয়ঙ্কর।" তিনি আরও জানান, যাঁরা এদিন বিক্ষোভে উপস্থিত ছিলেন শুধুমাত্র তাঁদের হিসেব এটি, এর বাইরে আরও বহু মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভে সামিল স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন:
- সুধাংশু মোদক: "আমার কাছ থেকে আবাস যোজনার নাম করে ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। এত বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে দেওয়ায় আমি ঘরের শুধুমাত্র ভিতটুকুই করতে পেরেছি। ওই টাকা ফেরত পেলে তবেই বাকি কাজ শেষ করতে পারব।"
- কুমুদিনী বর্মন: এক বৃদ্ধা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমার স্বামী নেই, এক ছেলে টোটো চালায় কিন্তু আমি একাই আলাদা খাই। ঘরের টাকা ঢুকেছে কিন্তু সেই টাকায় ঘর পুরোপুরি তৈরি করতে পারছি না। আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছিল, তাই আমি আজ টাকা ফেরত চাইতে এসেছি।"
- বীরেন বর্মন: তাঁর কাছ থেকে ১৮ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। এই টাকা দেওয়ার পর ঘরের কাজ শেষ করতে গিয়ে তিনি রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন।
- সুভারানী মোদক: তিনিও ঘর দেওয়ার নাম করে নেওয়া ১০ হাজার টাকা ফেরতের দাবিতে সরব হন।
বিশ্বজিৎ বর্মন নামে এক গ্রামবাসীর অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি বলেন, "আমার কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছিল। কিন্তু আমার অ্যাকাউন্টে ঘরের কোনো টাকা ঢোকেনি। ওনার সঙ্গে দেখা করলে জানান যে কাগজের সমস্যা আছে, সময় লাগবে।" বিশ্বজিতের দাবি, তাঁর নামে বরাদ্দ হওয়া আবাস যোজনার টাকা অন্য কোনো অ্যাকাউন্টে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
শুধু আবাস যোজনাই নয়, স্থানীয়দের দাবি, উপপ্রধান প্রিয়ঙ্কর রায় বর্মন এলাকায় পরিচিত একজন 'বালি মাফিয়া' হিসেবে। রঞ্জিত বর্মন নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, "নদীর চর বা যেকোনো খাসজমি দখল করে প্লট হিসেবে মাটি বিক্রির জন্য ২ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ টাকার টেন্ডার ডাকত এই তৃণমূল নেতা। সেই অনুযায়ী আমাদের কাছ থেকে ১ লক্ষ টাকা অগ্রিম নেওয়া হয়েছিল। এক বছর পেরিয়ে গেলেও মাটি কাটতে দেওয়া হয়নি।" রঞ্জিত আরও জানান, টাকা ফেরত চাইলে নির্বাচনের পর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ফল ঘোষণার পর থেকেই ওই নেতার আর কোনো দেখা মিলছে না।
প্রশাসনের কাছে অবিলম্বে এই ধরনের বালি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করার এবং গরিব মানুষের কষ্টার্জিত কাটমানির টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার কড়া দাবি জানিয়েছেন জড়াবাড়ি এলাকার বাসিন্দারা। তবে অভিযুক্ত উপপ্রধান পলাতক থাকায় তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি।
দেশ, রাজ্য ও কোচবিহার জেলার সমস্ত লেটেস্ট ব্রেকিং আপডেট সবার আগে পেতে চোখ রাখুন সংবাদ একলব্য-তে!
🌐 sangbadekalavya.in
সাংবাদিক - সমীর হোসেন
বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী সমীর হোসেন ২০২১ সালে 'সংবাদ একলব্য'-এর মাধ্যমে সিটিজেন জার্নালিস্ট হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পা রাখেন। বর্তমানে তিনি এই পোর্টালের একজন নির্ভরযোগ্য সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত। কোচবিহার জেলার শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে রাজনীতির ময়দান— সব ধরনের খবর অত্যন্ত নিষ্ঠা ও বস্তুনিষ্ঠতার সাথে পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর প্রধান কাজ।
ইমেইল: editor@sangbadekalavya.in
0 মন্তব্যসমূহ