সংবাদ একলব্য: ১ মে, আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস বা মে দিবস (International Workers' Day or May Day)। এই দিনটি বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের প্রতীক (Symbol of Struggle)। ১৮৮৬ সালের শিকাগো শহরের সেই ইতিহাস থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক ডিজিটাল যুগে (Digital Era), শ্রমিকের রূপ বদলেছে ঠিকই, কিন্তু শোষণের ধরন কি সত্যিই পুরোপুরি বদলেছে? আজকের দিনে কারখানার চিমনি থেকে বেরিয়ে আসা ধোঁয়ার জায়গা নিয়েছে স্মার্টফোনের স্ক্রিন, আর কারখানার সাধারণ শ্রমিকের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে এক নতুন শ্রেণি—যাদের বলা হয় 'গিগ ওয়ার্কার' (Gig Worker)।
ফিরে দেখা ১৮৮৬-র হে মার্কেট (The Haymarket Affair)
উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে শ্রমিকদের কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না। দিনে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা অমানবিক পরিবেশে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হতো তাঁদের। এর প্রতিবাদে এবং দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে (Demand for 8-hour workday) আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার শ্রমিক। ১ মে শুরু হওয়া সেই ঐতিহাসিক ধর্মঘট (Strike) চরম আকার নেয় ৪ মে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির ছোঁড়া বোমা বিস্ফোরণে রক্তে ভেসে যায় রাজপথ, প্রাণ হারান অসংখ্য নিরীহ শ্রমিক। তাঁদের সেই আত্মত্যাগের বিনিময়েই পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পায় আট ঘণ্টা কাজের অধিকার এবং শ্রমিকের মর্যাদা (Workers' Rights)।
যুগের পরিবর্তনে 'ডিজিটাল লেবার' (Digital Labour)
সময় গড়িয়েছে। প্রযুক্তির হাত ধরে গোটা বিশ্বে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন (Technological Advancement)। আজ আর সব শ্রমিককে কারখানার বদ্ধ ঘরে কাজ করতে হয় পলকে। প্রযুক্তির যুগে তৈরি হয়েছে 'গিগ ইকোনমি' (Gig Economy)। সুইগি (Swiggy), জোম্যাটো (Zomato), উবার (Uber) বা ওলা (Ola)-র মতো অ্যাপ-নির্ভর প্ল্যাটফর্মগুলোতে কাজ করা হাজার হাজার যুবক-যুবতী আজ এই নতুন অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
আজকের শোষণের নতুন চেহারা (Modern Exploitation)
গিগ ইকোনমির এই কর্মীদের কাগজে-কলমে কোনো কোম্পানির স্থায়ী কর্মী হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয় না। আইনি পরিভাষায় তাঁদের বলা হয় 'ডেলিভারি পার্টনার' (Delivery Partner) বা 'স্বাধীন ঠিকাদার' (Independent Contractor)। ফলে নির্দিষ্ট কাজের সময়সীমা তো দূরের কথা, প্রভিডেন্ট ফান্ড (Provident Fund), স্বাস্থ্যবিমা (Health Insurance), সবেতন ছুটি বা ইএসআই (ESI)-এর মতো ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষা (Social Security) থেকে তাঁরা সম্পূর্ণ বঞ্চিত।
আগে কারখানায় মালিক বা সুপারভাইজার থাকতেন, এখন সেই শোষকের জায়গা নিয়েছে নির্দয় 'অ্যালগরিদম' (Algorithm)। একজন ডেলিভারি বয় বা ক্যাব চালকের কাজ, আয় এবং ইনসেনটিভ (Incentive) পুরোপুরি নির্ভর করে অ্যাপের রেটিং (App Rating) এবং টার্গেট পূরণের ওপর। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাফিক সামলে ১০-১২ ঘণ্টা রাস্তায় ঘুরেও অনেক সময় ন্যূনতম মজুরি (Minimum Wage) তাঁদের পকেটে ঢোকে না।
সাদা কলারের কর্মীদের অদৃশ্য শিকল (White-Collar Workers)
অন্যদিকে, কর্পোরেট বা আইটি সেক্টরেও (IT Sector) কাজের চাপ আগের থেকে বহুগুণ বেড়েছে। 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' (Work from Home) বা ডিজিটাল কানেক্টিভিটির যুগে কাজের কোনো নির্দিষ্ট লগ-ইন বা লগ-আউট টাইম নেই। ছুটির দিনেও বস বা ক্লায়েন্টের ইমেইল ও মেসেজ যেন অদৃশ্য শিকল পরিয়ে রেখেছে কর্মীদের। ফলে বাড়ছে মানসিক অবসাদ (Mental Stress) ও শারীরিক অসুস্থতা।
১৩৮ বছর পর আজকের মে দিবসে দাঁড়িয়ে তাই অনিবার্যভাবেই একটি প্রশ্ন জাগে, হে মার্কেটের শহীদদের সেই 'আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম এবং আট ঘণ্টা নিজের জন্য'—এই মৌলিক দাবি কি আজও পুরোপুরি পূরণ হয়েছে? মে দিবস শুধু একটি সরকারি ছুটির দিন নয়, বরং এটি শ্রমিকদের অতীত লড়াইকে সম্মান জানানোর এবং বর্তমানের ডিজিটাল শোষণের (Digital Exploitation) বিরুদ্ধে নতুন করে নিজেদের অধিকার বুঝে নেওয়ার শপথের দিন।
দেশ-বিদেশ এবং সমাজ-রাজনীতির সমস্ত লেটেস্ট ব্রেকিং আপডেট ও বিশেষ প্রতিবেদন পড়তে চোখ রাখুন সংবাদ একলব্য-তে: sangbadekalavya.in
Sangbad Ekalavya Digital Desk
প্রতিদিনের ব্রেকিং নিউজ থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি এবং স্থানীয় সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ খবর তুলে আনে সংবাদ একলব্য ডিজিটাল ডেস্ক। সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সঠিক তথ্যটি দ্রুততম সময়ে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করাই আমাদের এই এডিটোরিয়াল টিমের প্রধান উদ্দেশ্য। সত্য ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাই আমাদের মূলমন্ত্র।
ইমেইল: editor@sangbadekalavya.in
0 মন্তব্যসমূহ