নয়াদিল্লি, সংবাদ একলব্য: লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে সংসদের বিশেষ অধিবেশনে এক নজিরবিহীন নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল ২০২৬) লোকসভায় পেশ করা '১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল ২০২৬' (যা মূলত মহিলা সংরক্ষণ এবং আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন সংক্রান্ত) প্রয়োজনীয় সমর্থন না পাওয়ায় খারিজ হয়ে গেল। শাসকদল বিজেপি এবং বিরোধী 'ইন্ডিয়া' (INDIA) জোটের মধ্যে দিনভর চলা তীব্র বিতর্কের পর ভোটাভুটিতে বিলটি আটকে যায়।
ভোটাভুটির সমীকরণ এবং সাংবিধানিক নিয়ম
যেহেতু এটি একটি সংবিধান সংশোধনী বিল ছিল, তাই নিয়ম অনুযায়ী লোকসভায় উপস্থিত সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের (Two-Thirds Majority) সমর্থন প্রয়োজন ছিল।
- বিলের পক্ষে ভোট: ২৯৮টি (মূলত এনডিএ শরিক দলগুলির ভোট)।
- বিলের বিপক্ষে ভোট: ২৩০টি (কংগ্রেস, তৃণমূল, ডিএমকে, সমাজবাদী পার্টি-সহ 'ইন্ডিয়া' জোট এবং অন্যান্য বিরোধী দলের ভোট)।
উপস্থিত মোট ৫২৮ জন সাংসদের মধ্যে বিলটি পাসের জন্য ৩৫২টি ভোটের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সরকার সেই ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে ব্যর্থ হওয়ায় স্পিকার ওম বিড়লা বিলটি খারিজ হওয়ার কথা ঘোষণা করেন।
বিরোধীদের আপত্তির মূল কারণ কী?
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মহিলা সংরক্ষণের মতো বিষয় থাকা সত্ত্বেও কেন বিরোধীরা এই বিলের বিপক্ষে ভোট দিল, তার পেছনে মূলত দুটি বড় কারণ রয়েছে:
- ১. ওবিসি (OBC) সাব-কোটার দাবি: কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি এবং আরজেডি-র মতো দলগুলির স্পষ্ট দাবি, ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণের ভেতরে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (OBC) মহিলাদের জন্য আলাদা সংরক্ষণের ব্যবস্থা (Sub-quota) রাখতে হবে। সরকারের বিলে এই সংস্থান না থাকায় তারা তীব্র আপত্তি জানায়।
- ২. ডিলিমিটেশন নিয়ে দক্ষিণ ভারতের ক্ষোভ: বিলের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশটি ছিল জনগণনার পর আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন। ডিএমকে (DMK), কংগ্রেস এবং বামদলগুলির যুক্তি হলো, দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি সাফল্যের সঙ্গে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করেছে, অন্যদিকে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলি (যেমন উত্তরপ্রদেশ, বিহার) তা পারেনি। এখন জনসংখ্যার ভিত্তিতে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস হলে দক্ষিণ ভারতের প্রতিনিধিত্ব মারাত্মকভাবে কমে যাবে, যা একপ্রকার 'শাস্তি' দেওয়ার সামিল।
অমিত শাহের কড়া আক্রমণ
লোকসভায় বিলটি আটকে যাওয়ার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিরোধীদের একহাত নেন। কংগ্রেসকে সরাসরি দেশের 'সবচেয়ে বড় ওবিসি-বিরোধী এবং নারী-বিরোধী দল' বলে আক্রমণ করেন তিনি। শাহ বলেন, "বিরোধীরা সুকৌশলে রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে দেশের কোটি কোটি মা-বোনেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করল। সংবিধানে ধর্মের ভিত্তিতে সংরক্ষণের কোনো জায়গা নেই, কিন্তু মুসলিম তোষণের রাজনীতির জন্যই এই বিলে আপত্তি জানাচ্ছে তারা।" তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, আগামী নির্বাচনে দেশের মহিলারা এর যোগ্য জবাব দেবেন।
রাহুল গান্ধী এবং বিরোধীদের পালটা যুক্তি
অন্যদিকে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সরকারের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, "সরকার আসলে ভোটের আগে মহিলা সংরক্ষণের নামে চমক দিতে চাইছে। সত্যিই যদি তারা মহিলাদের ক্ষমতায়ন চায়, তবে ডিলিমিটেশন এবং জনগণনার দীর্ঘমেয়াদি শর্ত তুলে দিয়ে অবিলম্বে সংরক্ষণ কার্যকর করুক।"
আগামী দিনের রাজনৈতিক প্রভাব
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিলটি লোকসভায় পাস না হলেও আগামী লোকসভা নির্বাচনে এটি একটি অন্যতম প্রধান ইস্যু হতে চলেছে। বিজেপি এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে বিরোধীদের 'নারী-বিরোধী' হিসেবে প্রচার করবে। অন্যদিকে, 'ইন্ডিয়া' জোট একে সামাজিক ন্যায়বিচার (OBC অধিকার) এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো (দক্ষিণ ভারতের অধিকার) রক্ষার জয় হিসেবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরবে।
জাতীয় রাজনীতি এবং সংসদের প্রতি মুহূর্তের ব্রেকিং আপডেট পেতে চোখ রাখুন সংবাদ একলব্য-তে: sangbadekalavya.in
Sangbad Ekalavya Digital Desk
প্রতিদিনের ব্রেকিং নিউজ থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি এবং স্থানীয় সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ খবর তুলে আনে সংবাদ একলব্য ডিজিটাল ডেস্ক। সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সঠিক তথ্যটি দ্রুততম সময়ে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করাই আমাদের এই এডিটোরিয়াল টিমের প্রধান উদ্দেশ্য। সত্য ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাই আমাদের মূলমন্ত্র।
ইমেইল: editor@sangbadekalavya.in
0 মন্তব্যসমূহ