আধুনিকতার ভিড়েও অমলিন ঐতিহ্য, দোল পূর্ণিমার প্রাক্কালে উত্তরবঙ্গে জ্বলল ‘বুড়ির ঘর’ বা ‘ভেরা ঘর’
মধুসূদন রায়, ময়নাগুড়ি: রঙের উৎসব দোলযাত্রার আগের দিন উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয় এক প্রাচীন লোকঐতিহ্য— ‘বুড়ির ঘর পোড়ানো’ বা ‘ভেরা ঘর’। দেশের অন্যান্য অংশে যা ‘হোলিকা দহন’, ‘ন্যাড়াপোড়া’ বা ‘চাঁচর’ নামে পরিচিত, উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ রাজবংশী সমাজে তারই স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী রূপ হলো এই উৎসব। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে আধুনিকতার ভিড়ে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন গ্রামে আজও এই প্রথা সযত্নে পালিত হয়ে আসছে।
প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি 'ভেরা ঘর'
স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই আচার অশুভ শক্তিকে দহন করে শুভ শক্তির আগমন ঘটায় এবং বসন্তের সূচনাকে স্বাগত জানায়। দেশের অন্যান্য রাজ্যে যেখানে কাঠ ও শুকনো পাতা পুড়িয়ে বনফায়ার জ্বালানো হয়, উত্তরবঙ্গের গ্রামগুলিতে এর রূপ একেবারেই ভিন্ন। এখানে সম্পূর্ণ দেশীয় ও প্রাকৃতিক উপাদান যেমন— শুকনো কলার পাতা, খড়, কাঁশ ঘাস, ডালপালা এবং বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয় এই ভেরা ঘর বা বুড়ির ঘর।
প্রথমে মাটিতে শুকনো কলার পাতা বিছিয়ে তার ওপর খড় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর আস্ত একটি লম্বা বাঁশ মাঝখানে দাঁড় করিয়ে পুনরায় খড়, কাঁশ ঘাস ও ডালপালা সমানভাবে দিয়ে শুকনো কলার পাতাকে দড়ির মতো ব্যবহার করে সেটিকে শক্তভাবে বাঁধা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এর মধ্যে অশুভ শক্তির প্রতীক হিসেবে একটি কুশপুত্তলিকাও স্থাপন করা হয়।
দোল পূর্ণিমার সন্ধ্যায় ঐতিহ্যবাহী আচার
দোল পূর্ণিমার আগের সন্ধ্যায় গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়ে পূজা অর্চনা করেন। খোল ও করতালের সুমধুর সঙ্গতে ভক্তিমূলক পরিবেশে বুড়ির ঘর বা ভেরা ঘরের চারপাশে সাত পাক ঘোরা হয়। এরপর শঙ্খধ্বনি ও হরিনাম সংকীর্তনের মধ্যে দিয়ে তাতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। আগুন জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত শিশু থেকে বৃদ্ধ, সকলেই সমস্বরে উচ্চারণ করেন— "আজি হামার ভেরা ঘর ছুবা, কালি হামার দোল, পূর্ণিমার চাঁদ উঠিসে, কও হরি বোল।" এই সমবেত ধ্বনি ও আগুনের লেলিহান শিখা যেন দোল উৎসবের আগমনী বার্তাকেই আরও উজ্জ্বল করে তোলে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই আচার শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক ঐক্যেরও এক অনন্য প্রতীক। শীতের বিদায়, বসন্তের আগমন এবং নতুন ফসলের আশীর্বাদ কামনার সঙ্গে এই উৎসবের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গ্রামীণ সমাজে এটি এক ধরনের সমবেত মিলনোৎসব।
বিলুপ্তির পথে লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণের ডাক
তবে শহরাঞ্চলে খোলা জায়গার অভাব এবং আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবে ভেরা ঘর পোড়ানোর প্রচলন ক্রমশ কমে আসছে। এই প্রাচীন লোকসংস্কৃতি আজ অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। তবুও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন গ্রামে এখনও এই ঐতিহ্য যে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয়, তা এই অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচায়ক। দোলের আগমনী বার্তা বহনকারী এই আগুনে দহন যেন শুধু একটি আচার নয়, বরং প্রজন্মান্তরে বহন করে চলা এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার— যা সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি বলেই মনে করছেন সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
Sangbad Ekalavya Digital Desk
প্রতিদিনের ব্রেকিং নিউজ থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি এবং স্থানীয় সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ খবর তুলে আনে সংবাদ একলব্য ডিজিটাল ডেস্ক। সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সঠিক তথ্যটি দ্রুততম সময়ে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করাই আমাদের এই এডিটোরিয়াল টিমের প্রধান উদ্দেশ্য। সত্য ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাই আমাদের মূলমন্ত্র।
ইমেইল: editor@sangbadekalavya.in
0 মন্তব্যসমূহ