Latest News

6/recent/ticker-posts

Ad Code

বারোকোদালীতে শুরু হল একুশ হাত মাশান পূজা ও উত্তর বঙ্গ লোকসংস্কৃতি মেলা, কীভাবে শুরু হল এই মেলা, এই মেলার বিশেষত্ব কী?

বারোকোদালীতে শুরু হল একুশ হাত মাশান পূজা ও উত্তর বঙ্গ লোকসংস্কৃতি মেলা, কীভাবে শুরু হল এই মেলা, এই মেলার বিশেষত্ব কী?

Barokodali masan puja



নিজস্ব সংবাদদাতা, তপন বর্মন:

মানবসভতার ঊষালগ্ন থেকেই নানারকম বিশ্বাস ও সংস্কারের ফলে লৌকিক দেবতার উৎপত্তি । আর এই লৌকিক দেবতাদের মধ্যে অন্যতম হলেন মাশান ঠাকুর। গোটা উত্তরবঙ্গ তথা কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং , আলিপুর ,দিনাজপুর,জেলা সহ নেপালের ঝাপামোরাং জেলা, আসামের ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া, বঙ্গাইগাঁও, কোকরাঝাড় ও নলবাড়ি প্রভৃতি জেলায় মাসান ঠাকুরের পূজা ব্যাপক ভাবে প্রচলিত হয়ে আসছে।

এই মাশান ঠাকুরের সংখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যেমন মতভেদ রয়েছে, তেমনি মাশান ঠাকুরের জন্ম নিয়েও নানান মত প্রচলিত। আবার মাশান ঠাকুরের নানান রূপভেদও লক্ষ্য করার মত। এ প্রসঙ্গে বারোকোদালী গ্রামের মাশান ঠাকুরের বিশালতা উল্লেখযোগ্য।


পূজা কমিটির দাবি বারোকোদালী ইয়ং ক্লাবের এই মাশান ঠাকুর উত্তরবঙ্গের সর্বোচ্চ মাশান ঠাকুর। যার উচ্চতা ২১ হাত। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে বারোকোদালী গ্রামে এই বিশাল আকৃতির মাশান বাবা পূজিত হয়ে আসছে।



কীভাবে শুরু হল এখানে মাশান পূজা?

এই প্রশ্নের উত্তরে বর্তমানে পূজা কমিটির উপদেষ্টা নিখিল চন্দ্র প্রধান জানান ছেলে বয়সে একদিকে বেকারত্ব অন্যদিকে লোকসংস্কৃতির প্রতি সুগভীর ভালোবাসা এরই মাঝে কয়েক জন মিলে এই মাশান পূজার উদ্যোগ নেন। ড. জয়ন্ত বর্মন বর্তমানে যিনি তুফানগঞ্জ ভাওয়াইয়া একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা তার উদ্যোগে এই ২১ হাত মাশান ঠাকুরের পূজা শুরু হয়। ভক্তবৃন্দের এতটাই সাড়া ফেলেছিল যে পরবর্তীতে এই পূজা উপলক্ষে এখানে মেলা বসে যায়। এছাড়াও তিনি জানান শৈশবে ডাবরিতে গরু বাঁধতে গিয়ে অনেক সময় লাল নিশান দেখতেন। বাড়িতে জিজ্ঞেস করলে বলত সেখানে মাশান বাবার পূজা হয়। তখনও তারা মাশান বাবার যে রূপ কেমন হয় তা জানতেন না। পরবর্তীতে সেই ভাবনা থেকেই এই মাশান পূজার উদ্যোগ।



এখানকার মাশান ঠাকুরের প্রতিমার উচ্চতা ২১ হাত। গদা কাঁধে নিয়ে মাশান ঠাকুর দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মাশান ঠাকুরের পায়ের কাছে বিশালাকার শাল মাছের মূর্তি রয়েছে। সেই সাথে বাম পাশে বাউদিয়া মাশান ঠাকুরের মূর্তি এবং ডান পাশে মুড়িয়া মাশান ঠাকুরের ছোটো মূর্তি বিদ্যমান। একসঙ্গে সবাই এখানে পূজিত হয়। মাশান পূজায় অনেকে পাঠা কবুতর মানত করেন। এখানে বলির প্রচলন আছে। পাঠা বা কবুতর বলি দেওয়া হয়। এতদ্দেশীয় তান্ত্রিক পূজারী দিয়ে মাশান বাবার পূজা করা হয়। প্রথা অনুযায়ী প্রসাদ হিসাবে দই চিরা কলা দিয়ে কলার ঢোঙায় পূজা করা হয়। এছাড়াও খিচুড়ির প্রচলন আছে।

ভক্তবৃন্দ তাদের মনস্কামনা পূরণ হলে অনেকে সোনা বা রূপার বেলপাতা সহ নানান অলঙ্কার নিবেদন করে থাকেন।


কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার বারোকোদালী গ্রামের ইয়ং ক্লাবের পরিচালনায় দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে এই মাশান পূজা ও এর পাশাপাশি উত্তর বঙ্গ সংস্কৃতি মেলা হয়ে আসছে। গত কাল এই পূজা মেলা উপলক্ষে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। জ্যান্ত মাশান ঠাকুর সহ নানান প্রদশর্নী অনুষ্ঠিত হয়। আজ ২০ জানুয়ারি এই মেলার শুভ উদ্বোধন হয়। এই দিন মাশান বাবার প্রতিমার উন্মোচন করেন কোচবিহার জেলা পরিষদের সদস্য সুশান্ত রাভা মহাশয় । এছাড়াও এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বারোকোদালি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান সুদর্শন রায়, বিধায়ক মালতি রাভা রায়, নিখিল চন্দ্র প্রধান সহ অনেকেই।

এই মেলা ২০শে জানুয়ারি ২০২৬ (৬ই মাঘ ১৪৩২) মঙ্গলবার থেকে ২৭শে জানুয়ারি ২০২৬ (১৩ই মাঘ) মঙ্গলবার পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। মেলার স্থান হলো কোচবিহারের বক্সিরহাট, বারকোদালী চৌপথী সংলগ্ন ময়দান।


এই মেলার প্রধান আকর্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে প্রদর্শনী, নাগরদোলা, ব্রেকড্যান্স, ড্রাগণ ট্রেন, চিত্রাহার, মিকি মাউস এবং বিভিন্ন লোকসংস্কৃতি অনুষ্ঠান।

Masan Thakur



এবারে আসা যাক মেলা বিশেষত্ব কী?

উত্তরবঙ্গ হল লোকসংস্কৃতির পীঠস্থান। এখানকার মানুষের সংস্কৃতি আজও বিশ্বে সমাদৃত। তাই মাশান পূজার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ রাজবংশী জনজাতির সংস্কৃতি তুলে ধরাও এই মেলার অন্যতম উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেলায় দেখা যায় রাজবংশী মানুষের গৃহস্থালীতে ব্যবহৃত হওয়া বিভিন্ন জিনিসের প্রদশর্নী। সেই রাজবংশী মানুষের বিভিন্ন খাবারের স্টল। যেখানে চ্যাং মাছের পোড়া, বেগুন পোড়া, সিদলের ছ্যাঁকা থেকে শুরু করে আরও নানান খাবারের দেখা মেলে।


মেলায় বসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আসর। প্রাণের গান ভাওয়াইয়া সংগীতের সুরে মুখরিত হয় বারোকোদালীর আকাশ বাতাস। সম্পূর্ণ লোক যন্ত্রের ব্যবহারে পরিবেশিত হয় সংগীতানুষ্ঠান। কোনও রকম আধুনিক সংগীত যন্ত্রের ব্যবহার এই অনুষ্ঠানে করা হয় না। এক কথায় পুরোপুরি উত্তরবঙ্গের রাজবংশী মানুষের লোকসংস্কৃতির একটা বিশুদ্ধ ভাবনার প্রতিফলন এই মেলায় লক্ষ্য করার মতো।

মেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের উন্মাদনা নজর কাড়ার মতো লক্ষ করা যায়। উত্তরবঙ্গ,আসাম থেকে হাজার হাজার মানুষ এই মেলায় আসেন বলে জানান পূজা কমিটির সদস্যরা।

এ প্রসঙ্গে পূজা কমিটির উপদেষ্টা নিখিল চন্দ্র প্রধান জানান " মেলা হল একটা মিলন স্থল। এই মিলন মেলায় সকলেই আসুন, আনন্দ উপভোগ করুন। সেই সাথে এই মেলায় প্রদর্শিত রাজবংশী সমাজের লোক প্রযুক্তির নানা বিষয় ও লোক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করুন এই প্রার্থনা রইল। "

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Ad Code