আজকের তাজা খবর
Advertisement

Kalipuja 2026 । মাটির প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত হোক এবারের কালীপুজো

Advertisement
how to decorate home with earthen lamps diyas kali puja diwali significance
প্রতীকী ছবি

কলকাতা: হেমন্তের হিমেল হাওয়ার হাত ধরে দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে আলোর উৎসব দীপাবলি এবং শক্তিরূপিণী দেবী কালীর আরাধনা। অমাবস্যার নিকষ কালো অন্ধকারকে দূর করে চারপাশ আলোকিত করে তোলার এই উৎসবে বর্তমানে বৈদ্যুতিক টুনি বাল্ব বা এলইডি (LED) আলোর দাপট অনেকটাই বেশি। কিন্তু হাজারো কৃত্রিম আলোর ঝলকানির মাঝেও একটি ছোট্ট মাটির প্রদীপের স্নিগ্ধ, কম্পমান শিখার যে অনাবিল সৌন্দর্য ও পবিত্রতা রয়েছে, তা কোনো আধুনিক আলোতেই পাওয়া সম্ভব নয়। এবারের কালীপুজোয় (Kali Puja 2026) আধুনিকতার ইঁদুরদৌড় থেকে বেরিয়ে এসে ঐতিহ্যের মাটির প্রদীপে নিজের বাড়ি সাজানোর পরিকল্পনা একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কেন আপনার মাটির প্রদীপ ব্যবহার করা উচিত এবং কীভাবে অভিনব উপায়ে প্রদীপের সাহায্যে বাড়িকে এক মায়াবী রূপ দেবেন, তার বিস্তারিত দিকনির্দেশনা এখানে তুলে ধরা হলো (Diwali home decoration ideas)।

কেন মাটির প্রদীপেই সাজাবেন বাড়ি?

১. প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য: দীপাবলি বা কালীপুজোর মূল কথাই হলো 'তমসো মা জ্যোতির্গময়'—অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা। হিন্দু শাস্ত্র ও প্রাচীন রীতিনীতি অনুযায়ী, মাটি হলো পঞ্চভূতের (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম) অন্যতম। মাটি দিয়ে তৈরি প্রদীপে যখন তেল বা ঘি দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়, তখন তা প্রকৃতির মূল উপাদানগুলোর এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করে। প্রদীপের শিখা সর্বদা ঊর্ধ্বমুখী হয়, যা মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি, জ্ঞান এবং ইতিবাচক শক্তির প্রতীক। অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে গৃহে শুভ শক্তির আবাহন করতেই যুগ যুগ ধরে মাটির প্রদীপ (Earthen diyas for Diwali) জ্বালানোর রীতি প্রচলিত।

২. দেশীয় মৃৎশিল্পীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন: কালীপুজো বা দীপাবলি এলেই রাস্তার মোড়ে মোড়ে পসরা সাজিয়ে বসেন প্রান্তিক মৃৎশিল্পীরা। চিনের তৈরি সস্তা বৈদ্যুতিক আলো এবং প্লাস্টিকের প্রদীপের দাপটে বাংলার এই প্রাচীন কুটিরশিল্প আজ চরম সংকটের মুখে। সারাবছর ধরে মাটি ছেনে, রোদে শুকিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে এই প্রদীপগুলো তৈরি করেন তাঁরা, শুধুমাত্র উৎসবের মরশুমে দু'পয়সা উপার্জনের আশায়। আপনি যখন বাজার থেকে মাটির প্রদীপ কেনেন, তখন কেবল নিজের বাড়িই আলোকিত করেন না, বরং একজন দরিদ্র মৃৎশিল্পীর বাড়ির অন্ধকারও দূর করেন। আপনার কেনা কয়েকটি প্রদীপ তাঁদের মুখে হাসি ফোটাতে এবং এই বিলুপ্তপ্রায় শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

৩. পরিবেশবান্ধব উৎসব উদযাপন: পরিবেশ দূষণ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমস্যা। দীপাবলিতে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের আলো বা ফাইবার গ্লাসের প্রদীপগুলো উৎসবের পর বর্জ্য হিসেবে পরিবেশে মিশে যায়, যা সহজে পচনশীল নয়। অন্যদিকে, মাটির প্রদীপ সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব বা ইকো-ফ্রেন্ডলি (Eco-friendly Diwali celebration)। উৎসব শেষে এগুলো সহজেই মাটিতে মিশে যায় এবং প্রকৃতির কোনো ক্ষতি করে না। এছাড়াও, মাটির প্রদীপে সর্ষের তেল বা তিলের তেল জ্বালানো হলে তা চারপাশের বাতাসকে জীবাণুমুক্ত ও বিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে বলে আয়ুর্বেদে উল্লেখ রয়েছে।

৪. স্নিগ্ধ ও মনোরম নান্দনিকতা: বৈদ্যুতিক আলোর প্রখরতা চোখের জন্য অনেক সময় পীড়াদায়ক হতে পারে। কিন্তু মাটির প্রদীপের হলদেটে, উষ্ণ আলো চোখের আরাম দেয় এবং চারপাশের পরিবেশে একটি প্রশান্তিদায়ক, মায়াবী ও পবিত্র আবেশ তৈরি করে। এই আলোয় বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন এক নস্টালজিক সৌন্দর্যে ভরে ওঠে, যা হাজার ওয়াটের বাল্বেও আনা সম্ভব নয়।

Eco friendly Diwali celebration with earthen diyas
ছবি: সংগৃহীত

মাটির প্রদীপ জ্বালানোর পূর্বপ্রস্তুতি

বাজার থেকে প্রদীপ কিনে এনে সরাসরি তাতে তেল ঢেলে জ্বালানো উচিত নয়। মাটির প্রদীপ দীর্ঘক্ষণ জ্বালিয়ে রাখার জন্য কিছু পূর্বপ্রস্তুতির প্রয়োজন:

জলে ভিজিয়ে রাখা: বাজার থেকে আনা নতুন মাটির প্রদীপগুলোকে অন্তত ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা পরিষ্কার জলে ডুবিয়ে রাখতে হবে। মাটি যেহেতু জল শোষণ করে, তাই সরাসরি তেল ঢাললে প্রদীপ প্রচুর তেল শুষে নেবে। জলে ভিজিয়ে রাখলে মাটির ছিদ্রগুলো জল দিয়ে পূর্ণ হয়ে যায়, ফলে পরে আর অতিরিক্ত তেল শোষণ করতে পারে না।

শুকিয়ে নেওয়া: জল থেকে তুলে প্রদীপগুলোকে ভালো করে রোদে বা বাতাসে শুকিয়ে নিতে হবে। প্রদীপের গায়ে যেন জল না থাকে, তা নিশ্চিত করুন। জল থাকলে প্রদীপ জ্বালানোর সময় ছিটকে ওঠার সম্ভাবনা থাকে।

তেল ও সলতের নির্বাচন: প্রদীপ জ্বালানোর জন্য সর্ষের তেল বা তিলের তেল সবচেয়ে ভালো। সাধ্য থাকলে খাঁটি গাওয়া ঘিও ব্যবহার করতে পারেন। সলতে হিসেবে খাঁটি সুতোর ব্যবহার বাঞ্ছনীয়। সলতেগুলোকে আগে থেকে তেলে ডুবিয়ে রাখলে প্রদীপ জ্বালানো সহজ হয় এবং শিখা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

Preparation of earthen lamps before lighting for Diwali
ছবি: সংগৃহীত

কীভাবে মাটির প্রদীপের আলোয় সাজাবেন বাড়ি?

বাড়ি সাজানোর ক্ষেত্রে একটু সৃজনশীলতা প্রয়োগ করলে সাধারণ মাটির প্রদীপ দিয়েই অসাধারণ রূপ দেওয়া সম্ভব। আপনার বাড়ির সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে নিচে কিছু অভিনব উপায় আলোচনা করা হলো:

১. সদর দরজা বা প্রবেশদ্বার: বাড়ির প্রবেশদ্বার হলো ইতিবাচক শক্তি প্রবেশের মূল পথ। প্রবেশদ্বারের ঠিক বাইরে দু'পাশে বড় আকারের দুটি মাটির প্রদীপ (যাকে অনেক সময় 'মঙ্গল প্রদীপ' বলা হয়) একটু উঁচু স্ট্যান্ডের ওপর বসিয়ে জ্বালাতে পারেন। দরজার সামনের মেঝেতে চালের গুঁড়ো, আবির বা গাঁদা-গোলাপের পাপড়ি দিয়ে সুন্দর আলপনা বা রঙ্গোলি আঁকুন। সেই রঙ্গোলির কেন্দ্রবিন্দুতে এবং প্রতিটি কোণে ছোট ছোট মাটির প্রদীপ বসিয়ে দিন। রঙ্গোলির রঙের ওপর প্রদীপের আলো পড়লে তা অতিথিদের চোখে এক জাদুকরী আবেশ তৈরি করবে (Diwali rangoli designs with diyas)।

২. ছাদ, ব্যালকনি ও জানালার কার্নিশ: কালীপুজোর রাতে দূর থেকে বাড়িটিকে সুন্দর দেখানোর জন্য ছাদের আলসে, ব্যালকনির রেলিং এবং জানালার কার্নিশ বরাবর সারিবদ্ধভাবে প্রদীপ সাজান। এক্ষেত্রে প্রতিটি প্রদীপের মাঝে সমান দূরত্ব বজায় রাখলে একটি চমৎকার জ্যামিতিক সৌন্দর্য তৈরি হয়। বাতাসের হাত থেকে প্রদীপের শিখাকে রক্ষা করতে কাঁচের চিমনি বা গ্লাস কভার ব্যবহার করতে পারেন, যা প্রদীপের আলোকে আরও মোহময় করে তোলে।

৩. সিঁড়ির ধাপ: বহুতল বা দোতলা বাড়ির ক্ষেত্রে সিঁড়ি সাজানো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপের দুই প্রান্তে একটি করে প্রদীপ রাখতে পারেন। অথবা, একটি ধাপে ডানদিকে এবং পরের ধাপে বাঁদিকে—এভাবে জিগজ্যাগ (Zig-zag) প্যাটার্নে প্রদীপ সাজালে তা দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় লাগে। প্রদীপের পাশে আমপাতা, গাঁদা বা গোলাপ ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দিলে উৎসবের মেজাজ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

৪. অন্দরমহল ও বসার ঘর (Living Room): বসার ঘরের মাঝখানে একটি পিতল বা কাঁসার বড় পাত্রে (যাকে উড়লি বলা হয়) জল ভরে নিন। সেই জলে কিছু সুগন্ধি ফুল ছড়িয়ে দিন এবং তার মাঝে ভাসমান ছোট মাটির প্রদীপ (ফ্লোটিং দিয়া) জ্বালিয়ে দিন। জলের ওপর প্রদীপের আলোর প্রতিফলন ঘরের পরিবেশকে প্রশান্তিময় করে তুলবে। ঘরের কোণে বা সেন্টার টেবিলের ওপর ছোট মাটির প্রদীপের গুচ্ছ বা ক্লাস্টার রাখতে পারেন।

৫. ঠাকুরঘর ও তুলসীতলা: হিন্দু ধর্মে ঠাকুরঘর ও তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালানো অত্যন্ত পুণ্যের কাজ বলে মনে করা হয়। কালীপুজোর সন্ধ্যায় বাড়ির তুলসীমঞ্চের চারপাশে প্রদীপ জ্বালান। ঠাকুরঘরে ইষ্টদেবতা বা দেবী কালীর ছবির সামনে একটি বড় আকারের ঘিয়ের প্রদীপ স্থাপন করুন, যা যেন সারা রাত ধরে নির্বিঘ্নে জ্বলতে পারে।

৬. রঙিন মাটির প্রদীপের ব্যবহার: সাধারণ পোড়ামাটির প্রদীপের পাশাপাশি বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন রঙের এবং সুন্দর নকশা করা মাটির প্রদীপ পাওয়া যায়। আপনি চাইলে সাধারণ প্রদীপ কিনে বাড়িতে নিজেই অ্যাক্রিলিক রং (Acrylic colors), চুমকি, পুঁতি ও আয়নার টুকরো (Mirror work) দিয়ে সেগুলোকে সাজিয়ে নিতে পারেন। এতে আপনার নিজস্ব শৈল্পিক ভাবনার প্রকাশ ঘটবে এবং বাড়ির সাজসজ্জায় একটি একান্ত ব্যক্তিগত ছোঁয়া থাকবে (Hand painted diyas for Diwali)।

Creative ways to decorate home with colorful diyas for Kali Puja
ছবি: সংগৃহীত

প্রদীপ জ্বালানোর ক্ষেত্রে নিরাপত্তামূলক সতর্কতা

আগুন নিয়ে উৎসব, তাই আনন্দ উদযাপনের পাশাপাশি নিরাপত্তার দিকটিও সমানভাবে মাথায় রাখতে হবে:

  • প্রদীপগুলো এমন জায়গায় রাখবেন না, যেখান থেকে সহজেই জানালার পর্দা, বিছানার চাদর বা কোনো দাহ্য পদার্থে আগুন লেগে যেতে পারে।
  • বাড়িতে ছোট শিশু বা পোষ্য প্রাণী থাকলে তাদের নাগালের বাইরে প্রদীপ রাখুন বা তাদের ওপর সর্বদা কড়া নজর রাখুন।
  • প্রদীপগুলো যেন স্থির ও সমতল জায়গায় বসানো থাকে, তা নিশ্চিত করুন।
  • হালকা বাতাসের কারণে প্রদীপ উল্টে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলে প্রদীপের নিচে একটু ভেজা মাটি বা আটা দিয়ে আটকে দিতে পারেন, এতে প্রদীপ ছিটকে যাওয়ার ভয় থাকে না।
  • জরুরি পরিস্থিতির জন্য হাতের কাছে সবসময় এক বালতি জল বা অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা রাখা বাঞ্ছনীয়।

কালীপুজো বা দীপাবলি কেবল বাহ্যিক অন্ধকারের বিনাশ নয়, অন্তরের কালিমা ও অহংকার দূর করারও উৎসব। একটি মাটির প্রদীপ যেমন নিজেকে নিঃশব্দে পুড়িয়ে চারপাশ আলোকিত করে, তেমনই এই উৎসব আমাদের ত্যাগের মাধ্যমে অপরের জীবনে আলো আনার শিক্ষা দেয়। এই বছর বিদেশি কৃত্রিম আলোর আড়ম্বর এড়িয়ে দেশীয় মাটির প্রদীপের স্নিগ্ধতায় মেতে উঠুন। আপনার কেনা ছোট্ট একটি প্রদীপের আলো আপনার গৃহকোণকে যেমন মায়াবী করে তুলবে, তেমনই বাংলার প্রত্যন্ত কোনো গ্রামের এক মৃৎশিল্পীর পরিবারের দীপাবলিকেও করে তুলবে আনন্দমুখর (Festival News Bengali)।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. কালীপুজো বা দীপাবলিতে মাটির প্রদীপ জ্বালানোর গুরুত্ব কী?

মাটির প্রদীপ পঞ্চভূতের মেলবন্ধন ঘটিয়ে আধ্যাত্মিক উন্নতি ও ইতিবাচক শক্তির প্রতীক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া এটি পরিবেশবান্ধব এবং দেশীয় মৃৎশিল্পীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সাহায্য করে।

২. নতুন মাটির প্রদীপ জ্বালানোর আগে কী করা উচিত?

নতুন মাটির প্রদীপগুলোকে অন্তত ৫-৬ ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে। এরপর রোদে শুকিয়ে নিয়ে তারপর তাতে তেল ও সলতে দিয়ে জ্বালানো উচিত, যাতে প্রদীপ অতিরিক্ত তেল শুষে না নেয়।

৩. প্রদীপ দিয়ে সুন্দরভাবে সদর দরজা কীভাবে সাজানো যায়?

সদর দরজার দু'পাশে দুটি মঙ্গল প্রদীপ স্ট্যান্ডের ওপর রেখে এবং মেঝেতে সুন্দর আলপনা বা রঙ্গোলি এঁকে তার প্রতিটি কোণে ছোট ছোট মাটির প্রদীপ বসালে বাড়ির প্রবেশদ্বার আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

Advertisement
Sangbad Ekalavya Logo

Sangbad Ekalavya Digital Desk

প্রতিদিনের ব্রেকিং নিউজ থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি এবং স্থানীয় সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ খবর তুলে আনে সংবাদ একলব্য ডিজিটাল ডেস্ক।

editor@sangbadekalavya.in

মন্তব্যসমূহ