ডিজিটাল ডেস্ক, নয়া দিল্লি: অনলাইনে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আনল সুপ্রিম কোর্ট। শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারে ঢালাও বা সর্বাত্মক বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা জারির আর্জি খারিজ করে শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, শিশুদের ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকার এবং তা ব্যবহারের অধিকার তাদের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারেরই অংশ। তবে এর পাশাপাশি অনলাইনে শিশুদের যৌন নির্যাতন ও হেনস্থা থেকে মুক্ত রাখতে এবং শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্ট (CSAM) দ্রুত শনাক্ত ও মুছে ফেলার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
প্রধান বিচারপতি নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে জানায়, শিশুদের নিরাপত্তা এবং তাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা এই দুই বিষয় একে অপরের পরিপন্থী নয়। কেবল সুরক্ষার অজুহাতে শিশুদের সম্পূর্ণভাবে ইন্টারনেট থেকে বঞ্চিত করা যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এমন একটি সুরক্ষিত পরিবেশ গড়ে তোলা, যা তাদের অধিকার কেড়ে না নিয়ে বরং তাদের সুরক্ষা দেবে।
বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার বিপদের বার্তা
আদালত সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, বয়সভিত্তিক ঢালাও নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে বিপরীত ফল হতে পারে। এর ফলে শিশুরা তথ্য পাওয়ার জন্য আরও বেশি অনিয়ন্ত্রিত ও বিপজ্জনক ওয়েবসাইটের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। এছাড়া, ইন্টারনেটে কোনো শিশু যদি প্রলোভন বা হুমকির মুখে পড়ে, তবে শাস্তি পাওয়ার ভয়ে বা নিষেধাজ্ঞা ভাঙার অপরাধবোধ থেকে তারা বাবা-মা কিংবা বিশ্বাসযোগ্য অভিভাবকদের কাছে সেই ঘটনার কথা প্রকাশ করতে দ্বিধা করবে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও নিয়ামক সংস্থার ব্যর্থতায় ক্ষোভ
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিতে পুনঃনির্দেশিত লিংক (Redirect Links) ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অর্থ দিয়ে শিশু যৌন নির্যাতনমূলক তথ্য প্রচারের কিছু চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট সুপ্রিম কোর্টের নজরে আনা হয়েছিল। এই ধরনের আপত্তিকর কনটেন্ট অনলাইনে বহাল তবিয়তে ছড়িয়ে পড়া সত্ত্বেও নিয়ামক কর্তৃপক্ষ এবং সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাগুলির নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে শীর্ষ আদালত।
আদালত উল্লেখ করে, বর্তমানে প্রচলিত রিপোর্টিং ব্যবস্থা প্রধানত ব্যক্তিগত অভিযোগের ওপর নির্ভরশীল। কোনো একটি প্ল্যাটফর্ম যদি একটি আপত্তিকর ফাইল বা কনটেন্ট শনাক্ত করে মুছেও দেয়, অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফ্ল্যাগ করা হয় না। ফলে কনটেন্টটি ইন্টারনেট থেকে সম্পূর্ণ সরাতে দীর্ঘ দেরি হয় এবং তা ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। আদালত স্পষ্ট জানায়, এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষ ও প্ল্যাটফর্মগুলির কার্যকর পদক্ষেপের জন্য আর অপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
জাতীয় ডেটাবেস ও প্ল্যাটফর্মভিত্তিক সমন্বয়ের নির্দেশ
শিশু নির্যাতনমূলক কনটেন্ট অবিলম্বে বন্ধ করতে কেন্দ্র সরকার ও সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাগুলিকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট:
পারসেপচুয়াল হ্যাশ ও URL ডেটাবেস: কেন্দ্রকে পারসেপচুয়াল হ্যাশ (Perceptual Hashes) এবং সংবেদনশীল URL-এর জন্য জাতীয় স্তরে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে একটি প্ল্যাটফর্মে কোনো আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও মিললে, হ্যাশ কোড ম্যাচ করে অন্যান্য সমস্ত প্ল্যাটফর্ম থেকেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ও দ্রুত শনাক্ত করে মুছে ফেলা সম্ভব হবে।
ভুল মুছে ফেলা রোধে সুরক্ষা: তবে প্রযুক্তির অন্ধ ব্যবহারের বিষয়েও সতর্ক করেছে আদালত। কেবল একটি মাত্র অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে যান্ত্রিকভাবে কোনো কনটেন্ট হ্যাশ ডেটাবেসে অন্তর্ভুক্ত করা বা মুছে ফেলা যাবে না। এর জন্য একাধিক স্তরের সত্যতা যাচাই ও সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখতে হবে।
অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা: ভুলবশত যদি কোনো সঠিক পোস্ট বা ফাইল মুছে যায়, তবে ব্যবহারকারীর জন্য উপযুক্ত অভিযোগ জানানো ও প্রতিকারের (Grievance Redressal) ব্যবস্থা রাখতে হবে। এছাড়া সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, এই বিশেষ হ্যাশ ডেটাবেস কেবল শিশু যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত কনটেন্ট সরাতেই ব্যবহার করা যাবে; অন্য কোনো সাধারণ কনটেন্ট সরানোর কাজে এর অপব্যবহার করা যাবে না।
প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সচেতনতা বাড়াতে জোর
শিক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্তর থেকেই ব্যাপক সচেতনতা ও সংবেদনশীলতা কর্মসূচি চালুর আর্জি জানিয়েছে আদালত। উদ্দেশ্য হলো ছোটবেলা থেকেই শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন করা, যাতে তারা কোনো হুমকি বা হেনস্থার মুখে পড়লে ভয় না পেয়ে নির্দ্বিধায় সাহায্য চাইতে পারে।
সর্বোচ্চ আদালতের এই ঐতিহাসিক নির্দেশ একদিকে যেমন শিশুদের সাংবিধানিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখল, তেমনই প্রযুক্তিগত নজরদারির নামে ডিজিটাল স্পেসে অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ আটকানোর রূপরেখাও নির্দিষ্ট করে দিল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন