নয়াদিল্লি: বহু বিলিয়ন ডলারের কর্পোরেট চুক্তি সামলানো থেকে শুরু করে সাহিত্যের জগতে পা রাখা— প্রাক্তন সফটব্যাংক (SoftBank) এক্সিকিউটিভ এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মের চেয়ারম্যান অলোক সামা (Alok Sama) ফের আলোচনায়। তাঁর বেস্টসেলিং স্মৃতিকথা ‘দ্য মানি ট্র্যাপ’ (The Money Trap)-এর ব্যাপক সাফল্যের পর, আগামী ২৩ নভেম্বর মুক্তি পেতে চলেছে তাঁর নতুন উপন্যাস ‘দ্য লায়নস শেয়ার’ (Alok Sama The Lion's Share)। সম্প্রতি ‘ফার্স্টপোস্ট’ (Firstpost)-এর বিনয় প্রভাকরের সঙ্গে এক একান্ত আলাপচারিতায় নিজের নতুন বই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-র ভবিষ্যৎ ও ঝুঁকি, আমেরিকায় ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা বিদ্বেষ এবং তাঁর প্রাক্তন বস মাসায়োশি সনকে নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন তিনি (National News Bengali)।
তিহার জেল ও কর্পোরেট পতন: উপন্যাসের প্রেক্ষাপট
অলোক সামার নতুন উপন্যাসটি শুরু হয় তিহার জেলে থাকা এক মূল চরিত্রকে দিয়ে, যে দাউদ ইব্রাহিমের আদলে তৈরি এক চরিত্রের কাছে নিজের জীবনের গল্প বলছে। কর্পোরেট জগতের গ্ল্যামার ছেড়ে হঠাৎ ফিকশন বা কল্পকাহিনি কেন? সামার কথায়, ফিকশন মানুষের জীবনের অস্পষ্টতা এবং ধূসর দিকগুলো তুলে ধরার স্বাধীনতা দেয়।
উপন্যাসটির মূল ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আইআইটি (IIT) এবং হার্ভার্ডে (Harvard) পড়াশোনা করে সিলিকন ভ্যালিতে সুন্দর পিচাই বা সত্য নাদেলার মতো সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানোর গল্প সকলেরই জানা। কিন্তু প্রবল পারিবারিক মূল্যবোধ ও উচ্চশিক্ষা থাকা সত্ত্বেও কিছু মানুষ কীভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে জেলে পৌঁছায়, সেই না-বলা গল্পই তিনি তুলে ধরেছেন। এ প্রসঙ্গে ম্যাককিনসের প্রাক্তন সিইও রজত গুপ্তার (Rajat Gupta) পতনের উদাহরণ টানেন তিনি। সামা জানান, তিহার জেলের নিখুঁত বর্ণনার জন্য তিনি এমন এক পরিচিত ব্যক্তির সাহায্য নিয়েছেন, যাঁর বাস্তবে তিহার জেলে থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছে।
উপন্যাসের মূল প্রশ্নটি করেছেন নায়কের কিশোরী কন্যা— “ভালো মানুষেরা কেন খারাপ কাজ করে?”
এআই (AI) বিপ্লব নাকি বিনিয়োগের বুদবুদ?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রসঙ্গে অলোক সামা মনে করেন, এটি একই সঙ্গে একটি যুগান্তকারী প্রযুক্তিগত বিপ্লব এবং একটি বিনিয়োগের বুদবুদ (AI bubble investment)— ঠিক যেমনটা রেলওয়ে বা নব্বইয়ের দশকের ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল। তিনি বলেন, “আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রতিটি কোম্পানিই আসলে একটি এআই কোম্পানি।” উদাহরণ হিসেবে তিনি বার্কলেজ (Barclays) ব্যাঙ্কের ৫ শতাংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রসঙ্গ টানেন, যা মূলত এআই-জনিত কর্মদক্ষতার কারণেই ঘটেছে।
তিনি স্বীকার করেন যে ওপেনএআই (OpenAI) বা অ্যানথ্রপিক (Anthropic)-এর মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) থেকে দূরে থাকাটা বিনিয়োগকারীদের জন্য ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। বাজারের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান:
- মাত্র চার-পাঁচ বছরের সংস্থা অ্যানথ্রপিক আজ ৬৫ বিলিয়ন ডলারের রান-রেট রেভিনিউ তৈরি করছে এবং ২ ট্রিলিয়ন ডলার ভ্যালুয়েশনে পাবলিক হওয়ার কথা ভাবছে, যেখানে ওপেনএআই ১.২৫ ট্রিলিয়ন ডলারে তহবিল সংগ্রহ করছে।
- তবে তাঁর প্রধান উদ্বেগের জায়গা হলো ‘লিভারেজ’ বা অতিরিক্ত ঋণ। গত দুই বছরে বিগ টেক কোম্পানিগুলো ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ নিয়েছে।
- কোরউইভ (CoreWeave)-এর মতো সংস্থার ফিনান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ১৫-১৬ শতাংশ সুদে ঋণের লেনদেন বাজারে প্রবল চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইতিমধ্যে সেরেব্রাস (Cerebras) বা সফটব্যাংকের মতো সংস্থার শেয়ারে বড়সড় পতন বা কারেকশন দেখা গেছে।
মাসায়োশি সন: ভবিষ্যতের মানুষ
সফটব্যাংকের কর্ণধার মাসায়োশি সনের (Masayoshi Son SoftBank) সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে সামা তাঁকে ‘অদম্য’ বলে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, মাসায়োশি সন ভবিষ্যতে বসবাস করেন এবং ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ মানুষের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। বর্তমানে সন এআই-এর ওপর সর্বস্ব বাজি ধরেছেন; ডলারের হিসেবে ওপেনএআই-তে তিনিই বৃহত্তম একক বিনিয়োগকারী এবং সফটব্যাংকের সবচেয়ে বড় হোল্ডিং ‘আর্ম’ (Arm)-ও মূলত একটি এআই সংস্থাতেই পরিণত হয়েছে। সামার স্পষ্ট কথা, “আমি কখনোই মাসায়োশি সনের বিরুদ্ধে বাজি ধরব না।”
আমেরিকায় ভারতীয় বিদ্বেষ, H-1B ভিসা ও ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং আমেরিকায় ভারতীয় ও ইন্ডিয়ান-আমেরিকানদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা ঘৃণার বিষয়ে সামা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন (H-1B visa crisis for Indians)। তবে তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, এইচ-১বি (H-1B) ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার হয়েছে। তাঁর মতে, প্রায় ৭০ শতাংশ ভিসাই ভারতীয় নিয়োগকর্তাদের হাতে গেছে, আমেরিকান কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে নয়— তাই এই ব্যবস্থায় কিছুটা পরিবর্তন বা রিসেট প্রয়োজন। তিনি বিশ্বাস করেন, ভারতীয়দের জন্য ‘আমেরিকান ড্রিম’ এখনও শেষ হয়ে যায়নি, তবে পথটা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রবাসী ভারতীয় মেধা দেশে ফিরিয়ে আনতে (Reverse Brain Drain) ভারতের কী করা উচিত? সামার মতে, এর কোনো চটজলদি সমাধান নেই। বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ভারতের একটিও প্রতিষ্ঠান না থাকাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আইআইটিগুলো মূলত স্নাতক স্তরের প্রতিষ্ঠান, কিন্তু সিলিকন ভ্যালির মূলে রয়েছে স্ট্যানফোর্ডের মতো গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়। চিন যেভাবে গত ২০ বছর ধরে শিক্ষা পরিকাঠামো এবং গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিপুল বিনিয়োগ করেছে— যেখানে আলিবাবা ও টেনসেন্টের মতো বেসরকারি সংস্থাগুলোও এগিয়ে এসেছে— ভারতে সেই গ্রাসরুট টেকনোলজি ও শিক্ষা পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে।
নিজের লেখালেখির ভবিষ্যৎ নিয়ে সামা জানান, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি (NYU) থেকে সাহিত্য ও লেখালেখির ওপর আড়াই বছরের পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রি অর্জন তাঁকে নিজের লেখার ধরন খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। ইতিমধ্যেই তিনি তাঁর তৃতীয় বইয়ের কাজ শুরু করেছেন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আমেরিকায় থাকা এক ভারতীয় যুবক, যে অর্থ বা প্রযুক্তির ইঁদুরদৌড়ে নেই, বরং নিজের মতো করে জীবনকে উপভোগ করতে চায়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন