মা আসছে ...

হিমালয়ে অবাধ নির্মাণ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের রেষারেষি! নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয় কি ভারতের জন্য অশনিসংকেত?

Himalayas construction boom hydropower risks Nepal disaster India China
Graphics: SE

নয়াদিল্লি: নেপালের সাম্প্রতিক হড়পা বান এবং ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় (Nepal Flood Disaster) আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বিশ্বের অন্যতম ভঙ্গুর পর্বতমালা হিমালয়ের বুকে অবাধ নির্মাণের ভয়ানক বিপদ। একদিকে বিশ্ব উষ্ণায়নের জেরে দ্রুত গলছে হিমবাহ, অন্যদিকে ভারত, চিন ও নেপালের মতো দেশগুলি পাল্লা দিয়ে হিমালয় অঞ্চলে (Himalayas Construction Risks) তৈরি করছে একের পর এক বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সুড়ঙ্গ ও বাঁধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লাগামছাড়া পরিকাঠামো উন্নয়নই ডেকে আনছে ভয়ংকর বিপদ এবং এটি ভারতের জন্যও বড় অশনিসংকেত হতে পারে।

হিমালয় জুড়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ছড়াছড়ি

‘এশিয়ান ওয়াটার টাওয়ার’ (Asian Water Tower) অঞ্চলে বর্তমানে ১১০০-রও বেশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প (Hydropower Projects in Himalayas) বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।

  • রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে তিব্বতে ১৯৩টির বেশি (কিছু অনুমানে ৩০০টিরও বেশি) বাঁধ তৈরি করেছে চিন।
  • নেপালের নিজস্ব সরকারি ডেটাবেস বলছে, সেখানে প্রায় ৫৭০টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বিভিন্ন পর্যায়ে নির্মাণাধীন। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, নেপাল হিমালয়ের সম্ভাব্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৫০,০০০ মেগাওয়াট।
  • ভবিষ্যতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) বা ডেটা সেন্টারগুলোর বিপুল বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে ভারতও কার্বন-মুক্ত শক্তি হিসেবে হিমালয়ের জলবিদ্যুৎকে হাতিয়ার করতে চাইছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি

হিমালয় এমনিতেই অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। তার ওপর ২০২২ সালের ‘নেচার জিওসায়েন্স’-এর গবেষণা জানাচ্ছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে (Climate Change Himalayas) ‘হাই মাউন্টেন এশিয়া’ অঞ্চলে হিমবাহ গলছে এবং পারমাফ্রস্ট (Permafrost) বা চিরহিমায়িত স্তর আলগা হয়ে যাচ্ছে।

এর ফলে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (GLOF) বা হিমবাহ সৃষ্ট হ্রদ ফেটে গিয়ে হড়পা বান এবং ধসের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে গিয়েছে। নেপালে চিন-তিব্বত সীমান্তের কাছে যে বিপর্যয় ঘটেছে, তার অন্যতম কারণ হিসেবে এই হিমবাহ গলা বা বরফ-পাথরের ধসকেই দায়ী করা হচ্ছে।

কৌশলগত রেষারেষি ও ভারতের পদক্ষেপ

হিমালয়ের বুকে পরিকাঠামো উন্নয়নের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতাও (India China Border Hydropower)। চিনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ইয়ারলুং সাংপো নদীর (ব্রহ্মপুত্রের উৎস) ওপর ৬০ গিগাওয়াট (GW) ক্ষমতার এক বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির পরিকল্পনা করেছে।

চিনের এই পদক্ষেপের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় ভারতও ওই নদীর প্রধান উপনদী সিয়াং-এর ওপর ১০ গিগাওয়াটের একটি মেগা-প্রজেক্টের ঘোষণা করেছে। এর পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলে সড়ক ও টানেল নির্মাণও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

উত্তরাখণ্ডের অতীত বিপর্যয় থেকে শিক্ষা

২০১৩ সালে উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথ বিপর্যয়ে (Uttarakhand Disaster) হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। সেই ভয়াবহ ঘটনার পর একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি অন্তত ২৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করার সুপারিশ করে এবং পরিবেশগত মূল্যায়নের ওপর জোর দেয়। পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রয়োজন থাকলেও, হিমালয়ের এই নাজুক পরিবেশের কথা মাথায় রেখে বিজ্ঞানসম্মত পরিকাঠামো গড়ার দিকেই এখন জোর দিচ্ছেন পরিবেশবিদ ও গবেষকরা।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. হিমালয়ে অবাধ নির্মাণের ফলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে?

হিমালয়ে অবাধ নির্মাণ এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে পারমাফ্রস্ট গলে গিয়ে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (GLOF) বা হড়পা বান এবং ভয়াবহ ধসের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

২. নেপালের বিপর্যয়ের সঙ্গে হিমালয়ের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কী সম্পর্ক?

বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালে নির্মীয়মাণ প্রায় ৫৭০টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং লাগামছাড়া পরিকাঠামো উন্নয়নের ফলেই হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, যা প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করছে।

৩. চিন ও ভারতের মধ্যে হিমালয়ে কী নিয়ে কৌশলগত রেষারেষি চলছে?

চিন ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর ৬০ গিগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করছে, যার মোকাবিলায় ভারতও সিয়াং নদীর ওপর ১০ গিগাওয়াটের প্রজেক্ট ঘোষণা করেছে, যা ভূ-কৌশলগত রেষারেষির অংশ।

Sangbad Ekalavya Digital Desk

প্রতিদিনের ব্রেকিং নিউজ থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি এবং স্থানীয় সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ খবর তুলে আনে সংবাদ একলব্য ডিজিটাল ডেস্ক।

editor@sangbadekalavya.in