ডিজিটাল ডেস্ক, সংবাদ একলব্য: শিক্ষক দিবস উপলক্ষে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় একগুচ্ছ নতুন উদ্যোগ ও বড় ধরনের সংস্কারের ঘোষণা করলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। নিউটাউনের বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে রাজ্যের শিক্ষাকাঠামোকে ঢেলে সাজানো, স্কুলে মোবাইল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, নতুন স্কুল মডেল তৈরি এবং শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে সার্বিক রূপান্তরের লক্ষ্যে দুটি নতুন প্রকল্পের কথা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী
শিক্ষক দিবসের মঞ্চ থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে সার্বিক রূপান্তরের লক্ষ্যে দুটি নতুন প্রকল্পের কথা জানানো হয়েছে:
সিএম শ্রী ইনস্টিটিউট (CM Shri Schools): কেন্দ্রীয় সরকারের ‘পিএম শ্রী’ বা কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের আদলে রাজ্যের প্রতিটি জেলায় দুটি করে আধুনিক মডেল স্কুল গড়ে তোলা হবে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে মেধার ভিত্তিতে পরীক্ষার মাধ্যমে এই স্কুলগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীরা ভর্তির সুযোগ পাবে। থাকবে ডিজিটাল ল্যাব ও আধুনিক স্মার্ট ক্লাসরুম।
সেন্টার অব এক্সিলেন্স অব স্পোর্টস: উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চলে ক্রীড়া পরিকাঠামো জোরদার করতে বড় দুটি ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, যেখানে এসএসসি (SSC)-র মাধ্যমে ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ করা হবে।
স্কুলে মোবাইল নিষিদ্ধকরণ ও পরিকাঠামো উন্নয়ন
শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের স্বার্থে স্কুলে মোবাইল ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সওয়াল করা হয়েছে। গুজরাটের শিক্ষানীতির প্রসঙ্গ টেনে জানানো হয়, স্কুলে মোবাইল ব্যবহারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আনার কথা ভাবা হচ্ছে।
পাশাপাশি, এনসিসি (NCC) ফিরিয়ে আনা, ব্রতচারী ও প্রাচীন ভারতীয় খেলাধুলো (যেমন খো-খো, হাডুডু) পুনর্জীবিত করার ওপর জোর দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনে সম্প্রতি এক শিক্ষার্থীর সাপের কামড় খাওয়ার ঘটনার উল্লেখ করে জানানো হয়, স্কুলের ফান্ড সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান করে দ্রুত পরিকাঠামোগত সংস্কার করা হবে। তাঁর কথায়, ‘‘ইতিমধ্যে আমরা শিক্ষাব্যবস্থার অনেক ক্ষতি করে ফেলেছি। আর হবে না।’’ সম্প্রতি কলকাতার ভাবানীপুরে মিত্র ইনস্টিটিউশনে এক পড়ুয়াকে সাপের ছোবল মারার প্রসঙ্গ তুলে বিগত সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘‘তিন বছর কম্পোজ়িট গ্র্যান্ট পাননি। সামান্যই টাকা। ওতে কিছু হয় না। কিন্তু ওই টাকায় কার্বলিক অ্যাসিড, ফিনাইল কেনা যায়।’’
ডিএ প্রসঙ্গে কি বললেন মুখ্যমন্ত্রী?
শিক্ষকদের মহার্ঘভাতা (ডিএ) সংক্রান্ত মামলা এখনও আদালতে বিচারাধীন। মুখ্যমন্ত্রী জানালেন, ওই বিষয়ে ইন্দু মলহোত্র কমিটির নির্দেশ মেনেই পদক্ষেপ করবে রাজ্য সরকার। এককালীন অর্থ দেওয়া সম্ভব না হলেও পর্যায়ক্রমে মহার্ঘভাতা মিটিয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি, স্বচ্ছ এবং ‘পরিশুদ্ধ’ শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘ভাষণ নয়, কাজে করে দেখাব।’’ সম্প্রতি রাজ্য সরকার পোষিত স্কুলগুলির শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের বকেয়া মহার্ঘভাতা নিয়ে রাজ্যকে অবস্থান স্পষ্ট করতে নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাই কোর্ট। আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে রাজ্যের কাছে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য ‘তাৎপর্যপূর্ণ’।
এদিন মুখ্যমন্ত্রী জানান, বিধানসভা নির্বাচনের সময় কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের সঙ্গে রাজ্য সরকারি কর্মীদের ডিএ-র ব্যবধান ছিল ৪২ শতাংশ। রাজ্য সরকার পুজোর আগে আগাম বেতন দেবে। তার সঙ্গে ২০ শতাংশ ডিএ যুক্ত থাকবে। তবে এটি বকেয়া ডিএ নয়।
শিক্ষকদের বকেয়া মহার্ঘভাতা প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে ডিএ বকেয়া নিয়ে লড়াই চলছে। আগের সরকার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কিছুটা দিতে বাধ্য হয়েছে। আমরা ক্ষমতায় এসে সরকারি কর্মচারী এবং পেনশনভোগীদের অনেকটা দিয়ে দিয়েছি। শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত হয়নি। সুপ্রিম কোর্টে বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘আমাদের সরকারের নীতি খুব পরিষ্কার। মলহোত্র কমিটি যা সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা মেনে নেব। আমরা হিসাব করেছি, শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষাকর্মীদের বকেয়া ভাতা দিতে গেলে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা লাগবে। আমরা হয়তো এক দিনে দিতে পারব না। তবে মলহোত্র কমিটি আমাদের নির্দেশ দিলে আমরাও সহযোগিতাও করব।’’ ডিএ-র প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘‘এটা অর্থনৈতিক সুরক্ষার বিষয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির যুগে অর্থনৈতিক সুরক্ষাটাও আমাদের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে দরকার।’’
স্বচ্ছভাবে হবে শিক্ষক নিয়োগ: মুখ্যমন্ত্রী
শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ‘পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পরিশুদ্ধ করার’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, পূর্বতন সরকার শিক্ষকের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছে অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এ বার সুপ্রিম কোর্ট এবং হাই কোর্টের নির্দেশ মেনেই নিয়োগ হবে এবং বেআইনি কাজ হবে না। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘নিশ্চিন্তে থাকুন। কোনও অন্যায় হবে না। আর শিক্ষকদের পড়ানোর বদলে যাতে সারাক্ষণ মিড-ডে মিলের হিসাব করতে না হয়, সে জন্য শিক্ষাকর্মীদেরও নিয়োগ করা হবে।’’