ওয়াশিংটন/তেহরান: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট (Middle East Crisis) এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে ফের চরম অস্থিরতার মেঘ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির ঘোষণা করে একে ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ (Economic D-Day) বলে আখ্যা দিয়েছেন।
'ইরানকে সমর্থন করলে চরম পরিণতি', হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, বিশ্বের কোনো দেশ যদি ইরানকে অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক সমর্থন জোগায়, তবে তাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে চরম ফল ভোগ করতে হবে। সম্প্রতি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ (Truth Social) একটি পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লেখেন, "আজ আমি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া সর্বকালের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক অভিযানের ঘোষণা করছি। এটি হবে এক নজিরবিহীন মাত্রার অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতা।"
কী এই 'ইকোনমিক ডি-ডে'? নিশানায় কোন কোন খাত?
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় মূলত ইরানের অর্থনীতির প্রধান লাইফলাইনগুলোকে টার্গেট করা হয়েছে (US Iran Conflict)। এর মধ্যে রয়েছে:
- তেল পাচারকারী নেটওয়ার্ক।
- আর্থিক লেনদেন ও নগদ অর্থের স্থানান্তর।
- বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউস বা মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্র।
- জাহাজের নিবন্ধন এবং বিভিন্ন ফ্রন্ট কোম্পানি বা বেনামী সংস্থা।
আমেরিকা হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, কোনো দেশের ব্যাঙ্ক, সরকারি সংস্থা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যদি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, তবে তাদের মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের 'অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি'-র (Operation Economic Fury) কোপে পড়তে হবে।
কীভাবে এই সংকটের শুরু? হোর্মুজ প্রণালী নিয়ে তরজা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালালে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর জুন মাসে ১৪-দফা বিশিষ্ট একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি এবং হোর্মুজ প্রণালী (Strait of Hormuz Blockade) পুনরায় খোলার বিষয়ে সম্মতি জানানো হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্পের দাবি, এই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে তেহরান। তাই এবার সরাসরি অর্থনৈতিক যুদ্ধের পথে হাঁটছে আমেরিকা।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় এই হোর্মুজ প্রণালী দিয়ে। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, বর্তমানে মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে প্রণালীটি খোলা রয়েছে এবং সেখান দিয়ে প্রচুর জাহাজ যাতায়াত করছে।
তবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাকের গালিবাফ আমেরিকার এই দাবি সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দিয়েছেন। তিনি পালটা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, যতদিন না আমেরিকা তাদের ১৪-দফা চুক্তির শর্তগুলো মানছে, ততদিন হোর্মুজ প্রণালী খোলা হবে না। গালিবাফ আরও জানান, "আমেরিকার যেকোনো আগ্রাসনের পালটা এবং ধ্বংসাত্মক জবাব দিতে প্রস্তুত রয়েছে ইরান।"
তেলের বাজারে কী প্রভাব পড়বে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই 'ইকোনমিক ডি-ডে' এবং ইরানের হোর্মুজ প্রণালী বন্ধ রাখার হুমকির ফলে বিশ্বজুড়ে অশোধিত তেলের (Crude Oil Price Impact) বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ভারত, চিন, জাপানের মতো যেসব দেশ একসময় ইরানের তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা ছিল, তাদের সামনেও এখন বড় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এই চরম উত্তেজনার আবহে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ঠিক কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত 'ইকোনমিক ডি-ডে' (Economic D-Day) কী?
এটি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা একটি সর্বকালের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক অভিযান, যার মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানের অর্থনীতিকে বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।
২. 'অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি' (Operation Economic Fury) কী?
এটি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের একটি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অভিযান, যার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক বা আর্থিক সম্পর্ক রাখা যেকোনো দেশের ব্যাঙ্ক, সংস্থা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে চরম শাস্তির মুখে পড়তে হবে।
৩. হোর্মুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) নিয়ে কেন সংকট তৈরি হয়েছে?
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে যায়। আমেরিকা দাবি করছে প্রণালী খোলা আছে, কিন্তু ইরান পালটা হুমকি দিয়েছে যে, আমেরিকার অবরোধ না তুললে তারা এই প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ রাখবে, যা বিশ্ব তেলের বাজারে বড়সড় সংকট তৈরি করতে পারে।