নয়াদিল্লি: ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে সরাসরি রেল সংযোগ (India-Russia Direct Rail Link) স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা ফের গতি পেয়েছে। রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী মরাত খুসনুলিন (Marat Khusnullin) সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য রেল সংযোগ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনার কথা জানিয়েছেন এবং এই মেগা প্রকল্পের জন্য কিছু বিকল্প রুট বা পথের পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রস্তাবিত রুট বা পথ কেমন হবে?
ভারত-রাশিয়া সরাসরি রেল সংযোগের জন্য যে বিকল্প পথের কথা ভাবা হচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম হল— রাশিয়ার মস্কো (Moscow) থেকে শুরু করে কাজাখস্তান (Kazakhstan) এবং তুর্কমেনিস্তানের (Turkmenistan) বিদ্যমান রেল নেটওয়ার্ক হয়ে ইরানের (Iran) রেল নেটওয়ার্কে প্রবেশ। এরপর ইরানের ভেতর দিয়ে সোজা বন্দর আব্বাস (Bandar Abbas) বা চাবাহার-জহেদান (Chabahar-Zahedan) রেললাইনের মাধ্যমে চাবাহার বন্দর পর্যন্ত ট্রেন পৌঁছাবে।
বর্তমানের ব্যবস্থা অনুযায়ী, ইরানের এই বন্দরগুলি থেকে জাহাজের মাধ্যমে মালপত্র ভারতে পাঠানো হয়। তবে, ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় আফগানিস্তানের (Afghanistan) ভেতর দিয়ে সরাসরি স্থলপথে ভারতে রেল সংযোগ স্থাপনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।
কেন এই নতুন রেললাইনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে?
১. বৈশ্বিক সমুদ্রপথে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি
- হরমোজ প্রণালীর (Strait of Hormuz) সংকট: আমেরিকা, ইজরায়েল এবং ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনার কারণে হরমোজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ব্যাপক বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। বিশ্বের প্রায় ২০-২৫% অপরিশোধিত তেল এবং ২০% এলএনজি (LNG) এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথটির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সুরক্ষার জন্য একটি বড় হুমকি।
- বসফরাস প্রণালীতে (Bosphorus Strait) বাধা: অন্যদিকে, কৃষ্ণ সাগরে (Black Sea) রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাণিজ্যিক জাহাজগুলিতে হামলার সংখ্যা বেড়েছে। এর ফলে তুরস্ক নিয়ন্ত্রিত বসফরাস প্রণালীতে ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য বজায় রাখতে রাশিয়ার বিকল্প রুট অত্যন্ত প্রয়োজন।
২. বাণিজ্যের সময় ও খরচ সাশ্রয়
নতুন এই রেল সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে প্রথাগত সুয়েজ খাল (Suez Canal) রুটের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমবে। এর ফলে পণ্য পরিবহণের সময় অন্তত ২০ থেকে ২৫ দিন হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং মালপত্র বহনের খরচও প্রায় ৩০% পর্যন্ত কমবে।
৩. কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin) আগেই বাল্টিক (Baltic) ও বারেন্টস (Barents) সাগর থেকে সরাসরি ভারত মহাসাগর পর্যন্ত একটি আধুনিক লজিস্টিক্স নেটওয়ার্ক তৈরির মেগা প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছিলেন। এই রেল করিডরটি তারই অংশ। এর মাধ্যমে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিশেষ করে জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর আমদানি-রফতানি আরও শক্তিশালী এবং দ্রুততর হবে।
এই রেল সংযোগটি শুধু দুই দেশের অর্থনীতিকেই চাঙ্গা করবে না, বরং পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বিকল্প এবং নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে প্রস্তাবিত রেল রুটটি কোন কোন দেশের ওপর দিয়ে যাবে?
প্রস্তাবিত রুটটি রাশিয়ার মস্কো থেকে শুরু করে কাজাখস্তান ও তুর্কমেনিস্তান হয়ে ইরানে প্রবেশ করবে। সেখান থেকে সমুদ্রপথে বা ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে স্থলপথে ভারতে যুক্ত হবে।
২. নতুন এই রেললাইনের ফলে বাণিজ্যে কী সুবিধা হবে?
এই রেল সংযোগ তৈরি হলে প্রথাগত সুয়েজ খাল রুটের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। এর ফলে পণ্য পরিবহণের সময় অন্তত ২০-২৫ দিন কমবে এবং খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ সাশ্রয় হবে।
৩. হরমোজ প্রণালীর সংকটের সঙ্গে এই রেললাইনের সম্পর্ক কী?
সামরিক উত্তেজনার কারণে হরমোজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে ঝুঁকি বেড়েছে। তাই ভারত ও রাশিয়ার নিরাপদ বাণিজ্যের জন্য এই বিকল্প স্থলপথের প্রস্তাব করা হয়েছে।