মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ফের বড় ধরনের বিস্ফোরণ এবং সামরিক উত্তেজনা। ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের লাগাতার ড্রোন হামলার কড়া জবাব দিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব। গত ২৮ জুলাই, ২০২৬ (মঙ্গলবার), মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এবং সৌদি আরবের সশস্ত্র বাহিনী যৌথভাবে পূর্ব ইরাকে অবস্থিত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) বা আইআরজিসি-র নির্দেশিত ইরান-সমর্থিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর একাধিক সামরিক ও লজিস্টিক ঘাঁটিতে নিখুঁত বিমান হামলা (Precision Strikes) চালিয়েছে।
গত ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ইরাক থেকে মার্কিন সেনা ও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে ৩০টিরও বেশি এরিয়াল ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল। এরই সরাসরি প্রতিক্রিয়া এবং আত্মরক্ষার্থে এই যৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
ড্রোন হামলা এবং সৌদির জ্বালানি স্থাপনায় হুমকি
সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া বহুমুখী ইরান যুদ্ধের পর থেকে ইরান এবং তাদের সমর্থিত প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো (যেমন ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস বা পিএমএফ) গোটা অঞ্চলে মার্কিন ও মিত্র দেশগুলোর স্বার্থে আঘাত হানার চেষ্টা করে আসছে।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি একটি বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ এবং রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোলিয়াম স্থাপনাগুলোতে ড্রোন হামলা চালানোর চেষ্টা করে। তবে সৌদির অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে সেই ড্রোনগুলোকে মাঝপথেই ধ্বংস করে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া কিছু স্যাটেলাইট ইমেজে সৌদি আরামকোর (Saudi Aramco) আবকাইক তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রের কাছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেলেও, বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে।
মার্কিন সেন্টকম এবং সৌদি আরবের কড়া বার্তা
হামলার পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে বলেছে, "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের যুদ্ধবিমানগুলো পূর্ব ইরাকে অবস্থিত একাধিক সন্ত্রাসী লজিস্টিক এবং অস্ত্রাগারে যৌথ হামলা চালিয়েছে। এটি গত ৭২ ঘণ্টায় আইআরজিসি-র নির্দেশে হওয়া ড্রোন হামলাগুলোর একটি শক্ত জবাব।" সেন্টকম তাদের পরিসংখ্যানে উল্লেখ করেছে যে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো মার্কিন নাগরিক ও স্থাপনাগুলোর ওপর ৬০০টিরও বেশি হামলার চেষ্টা করেছে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, আইআরজিসি ও তাদের প্রক্সিগুলোকে অবিলম্বে এই আগ্রাসন থামাতে হবে, অন্যথায় আরও বড় পরিসরে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, মেজর জেনারেল আল-মালিকি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, জাতিসংঘের সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত 'আত্মরক্ষার অধিকার' মেনেই এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সৌদি আরব নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা, ভূখণ্ড এবং অর্থনৈতিক সম্পদ রক্ষায় সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং "উপযুক্ত সময়ে ও স্থানে" আক্রমণকারীদের জবাব দেওয়ার অধিকার তারা সংরক্ষণ করে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও আঞ্চলিক অস্থিরতা
বিবিসি এবং এপি নিউজ-এর সংবাদ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই যৌথ হামলা মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) জানিয়েছে, তারা একই দিনে জর্ডান সীমান্তের কাছে ডেড সি এলাকায় দুটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে, যেগুলোর উৎস সম্পর্কে তদন্ত চলছে। জর্ডানও তাদের আকাশসীমায় অবৈধ ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে।
লোহিত সাগর ও হরমোজ প্রণালীতে প্রভাব
লোহিত সাগর (Red Sea) এবং হরমোজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের লাগাতার আক্রমণের বিষয়টিও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বারবার উঠে আসছে। দ্য হিন্দু এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের মতে, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা দাবি করেছে যে তারা সৌদি আরবের ইয়ানবু তেল বন্দরের দিকে যাওয়া একটি ট্যাংকারে ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুঁড়েছে। হুথিদের দাবি, ওই জাহাজটি তাদের ঘোষিত সামুদ্রিক অবরোধ লঙ্ঘন করেছিল। এর ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং লোহিত সাগর দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা এবং ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
এই সংঘাত এমন একটা সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে হরমোজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি কূটনৈতিক যুদ্ধবিরতির আলোচনা চলছিল। মার্কিন প্রশাসন সাময়িকভাবে ইরানে সরাসরি হামলা স্থগিত করলেও, ইরাক থেকে নতুন করে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ড্রোন হামলার কারণে সেই যুদ্ধবিরতির আশা আপাতত মুখ থুবড়ে পড়েছে। রয়টার্সের সূত্র অনুযায়ী, ইরানের একাংশ মনে করছিল যে আমেরিকার এই হামলা স্থগিত করার বিষয়টি একটি "কৌশলগত" পদক্ষেপ মাত্র।
একনজরে হামলার সারসংক্ষেপ:
- হামলার লক্ষ্য: পূর্ব ইরাকে অবস্থিত ইরান-সমর্থিত পিএমএফ (PMF) এবং আইআরজিসি (IRGC) নির্দেশিত মিলিশিয়াদের অস্ত্র ও লজিস্টিক ঘাঁটি।
- হামলার প্রেক্ষাপট: মার্কিন সেনা এবং সৌদি আরবের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে লাগাতার ৩০টির বেশি অবৈধ ড্রোন হামলা।
- অংশগ্রহণকারী দেশ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের যৌথ বিমান বাহিনী।
- ভবিষ্যৎ প্রভাব: বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে চরম অস্থিরতা, হরমোজ প্রণালী এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বৃদ্ধি।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. ইরাকে কারা যৌথ বিমান হামলা চালিয়েছে?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের সশস্ত্র বাহিনী যৌথভাবে পূর্ব ইরাকে এই বিমান হামলা চালিয়েছে।
২. কেন মার্কিন ও সৌদি বাহিনী ইরাকে হামলা চালাল?
ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা লাগাতার ড্রোন হামলা এবং সৌদির তেল ও জ্বালানি স্থাপনায় হুমকির কড়া জবাব দিতে আত্মরক্ষার্থে এই হামলা চালানো হয়েছে।
৩. আইআরজিসি (IRGC) কী?
আইআরজিসি (IRGC) হলো ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস, যারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠীকে সমর্থন ও পরিচালনা করে থাকে।