ইনক্রিমেন্ট লসের ধাক্কায় আর্থিক ক্ষতি! লস্ট ইনক্রিমেন্ট ফেরানোর দাবিতে শিক্ষামন্ত্রীর দ্বারস্থ শিক্ষক সংগঠন

APGTWA teachers demand restoration of lost increments to Education Minister Dipak Barman
ছবি: ইনক্রিমেন্ট লস ও উৎসশ্রী পোর্টাল নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে ডেপুটেশন

কলকাতা: বিএড (B.Ed) প্রশিক্ষণ জনিত জটিলতার কারণে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়সীমায় রাজ্যের কয়েক হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার ইনক্রিমেন্ট লস বা বেতন বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে রয়েছে। এই বকেয়া ইনক্রিমেন্ট অবিলম্বে পুনরুদ্ধার (Increment Restoration) এবং জেনারেল নোটিফিকেশন প্রকাশের দাবিতে মঙ্গলবার স্কুল শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনের সাথে সাক্ষাৎ করে স্মারকলিপি প্রদান করল রাজ্যের অগ্রণী শিক্ষক সংগঠন "অল পোস্ট গ্র্যাজুয়েট টিচার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন" (APGTWA)। প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হওয়া ভুক্তভোগী শিক্ষকদের পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুত নোটিফিকেশন জারির আর্জি জানানো হয়েছে এই দাবিপত্রে।

কেন ইনক্রিমেন্ট লসের মুখে পড়লেন শিক্ষকেরা? ৭টি প্রধান কারণ

শিক্ষক সংগঠনের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে ইনক্রিমেন্ট বন্ধ হওয়ার পেছনে মূলত শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামোগত সাতটি বড় ত্রুটি ও সরকারি নিয়মাবলিকে দায়ী করা হয়েছে:

  1. পর্যাপ্ত বিএড কলেজের অভাব: রাজ্যে পর্যাপ্ত বিএড কলেজ না থাকা এবং ডেপুটেড শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত আসন ফাঁকা না থাকায়, স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC) ও মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন দ্বারা নিযুক্ত অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকেরা প্রথম ৫ বছরের মধ্যে বিএড ডিগ্রি লাভ করতে পারেননি।
  2. স্কুলের ছাড়পত্রের সীমাবদ্ধতা: বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে দুইয়ের বেশি অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকলেও, সরকারি নিয়মে একটি শিক্ষাবর্ষে সর্বাধিক দু'জনকেই বিএড কোর্সে ভর্তির অনুমতি দেওয়া হতো। তাঁরা কোর্স শেষ করে ফিরলে তবেই পরবর্তী দু'জন সুযোগ পেতেন।
  3. কোর্সের সময়সীমা বৃদ্ধি: ২০১৫ সাল থেকে এনসিটিই (NCTE)-এর নির্দেশ অনুসারে বিএড কোর্সের সময়কাল ১ বছর থেকে বাড়িয়ে ২ বছর করা হয়। এর ফলে কলেজগুলির পরিকাঠামোগত অভাবের কারণে এক ধাক্কায় আসন সংখ্যা অর্ধেক হয়ে যায়।
  4. তিন বছরের অভিজ্ঞতার কড়াকড়ি: উচ্চ প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক বিভাগের 'অ্যাডিশনাল পোস্টে' নিযুক্ত শিক্ষকদের চাকরি জীবন ৩ বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত বিএড করার অনুমতি দেওয়া হতো না।
  5. মেথড সাবজেক্টের অভাব: ফিলোসফি, এডুকেশন, নিউট্রিশন, কমার্স-সহ বেশ কিছু বিষয়ের মেথড পেপার বেশিরভাগ বিএড কলেজে না থাকায় শিক্ষকেরা সুযোগ পাননি।
  6. নম্বরের বাধ্যবাধকতা: স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরে ৫০% নম্বর না থাকার কারণে কয়েক হাজার শিক্ষক বিএড ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
  7. ওডিএল (ODL) ও ডিএলএড (D.El.Ed) জটিলতা: ওডিএল মোডে বিএড করার সুযোগ মূলত উচ্চ প্রাথমিকের শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষকেরা বঞ্চিত হন। পরবর্তীতে ২০১৭-২০১৯ সালে ৫০% নম্বর না থাকা শিক্ষকেরা NIOS থেকে D.El.Ed করলেও, বিভিন্ন জেলার ডিআই (DI) গণ উচ্চ প্রাথমিকের কিছু শিক্ষক ছাড়া বাকিদের বন্ধ ইনক্রিমেন্ট চালু করতে অস্বীকার করেন। ফলে অনেককে পুনরায় বিএডে ভর্তি হতে হয় এবং একাধিক ইনক্রিমেন্ট লস হয়।

আগের নোটিফিকেশনের নজির, শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাস

আন্দোলনকারীদের দাবি, এর আগে ২০০২ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে নিযুক্ত শিক্ষকেরা দু'টি সরকারি নোটিফিকেশনের মাধ্যমে তাঁদের লস্ট ইনক্রিমেন্ট ফিরে পেয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে যোগদানকারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ০১/০৭/২০২৫ তারিখ পর্যন্ত ইনক্রিমেন্ট পুনরুদ্ধারের কোনো নোটিশ শিক্ষা দপ্তর এখনও দেয়নি।

এদিন কর্মসূচীতে উপস্থিত সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক চন্দন গরাই এবং ভুক্তভোগী শিক্ষক শুভব্রত গোস্বামী, সুশীল কুমার বাগ ও সুশান্ত বসাকদের কাছ থেকে শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন পূর্বের সেই দু'টি নোটিফিকেশন চেয়ে নেন এবং পুরো বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার আশ্বাস দেন। সংগঠনের রাজ্য সভাপতি মনোজ কুমার মন্ডল এবং মালদার শিক্ষক সুশান্ত বসাক স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইনক্রিমেন্ট লসের দায় শিক্ষকদের নয়, তাই শিক্ষা দপ্তরের উচিত অতি দ্রুত নোটিফিকেশন জারি করে এই পেশাগত ও আর্থিক সমস্যার সমাধান করা।

উৎসশ্রী পোর্টাল আনলক ও বদলির নিয়ম পরিবর্তনের দাবি

ইনক্রিমেন্ট সমস্যার পাশাপাশি এদিন উৎসশ্রী (Utsashree) পোর্টাল নিয়ে আধিকারিকদের সাথে দীর্ঘ আলোচনা করেন সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক চন্দন গরাই। যাঁরা পোর্টালে আবেদন করতে পারছেন না তাঁদের প্রোফাইল আনলক করা, একাধিকবার মিউচুয়াল ট্রান্সফারের সুযোগ দেওয়া, পূর্বের ঝুলে থাকা আবেদনগুলির দ্রুত অর্ডার দেওয়া এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষক বদলির নিয়মকানুন পরিবর্তনের দাবিও জানানো হয়েছে এদিনের ডেপুটেশনে।

শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট লস সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট লস বা বেতন বৃদ্ধি বন্ধ হলো কেন?

উত্তর: নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিএড (B.Ed) প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে না পারার কারণে শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট বন্ধ হয়েছে। এর পেছনে বিএড কলেজের অভাব, আসন সংখ্যা হ্রাস এবং স্কুলের ছাড়পত্রের সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করেছে শিক্ষক সংগঠন।

প্রশ্ন ২: লস্ট ইনক্রিমেন্ট ফেরানোর দাবিতে কারা ডেপুটেশন দিয়েছে?

উত্তর: "অল পোস্ট গ্র্যাজুয়েট টিচার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন" (APGTWA) শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনের কাছে লস্ট ইনক্রিমেন্ট পুনরুদ্ধারের দাবিতে ডেপুটেশন দিয়েছে।

প্রশ্ন ৩: উৎসশ্রী পোর্টাল নিয়ে কী কী দাবি জানানো হয়েছে?

উত্তর: উৎসশ্রী পোর্টালে প্রোফাইল আনলক করা, একাধিকবার মিউচুয়াল ট্রান্সফারের সুযোগ, ঝুলে থাকা আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বদলির নিয়মকানুন পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়েছে।

Sangbad Ekalavya Digital Desk

প্রতিদিনের ব্রেকিং নিউজ থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি এবং স্থানীয় সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ খবর তুলে আনে সংবাদ একলব্য ডিজিটাল ডেস্ক।

editor@sangbadekalavya.in