পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর (PoK)-এর বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন হিংসা, রক্তপাত এবং ব্যালট লুঠের ঘটনা সামনে এল। সোমবার প্রথম দফার ভোটগ্রহণ শুরু হতেই বিভিন্ন বুথে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নেয় যে এক দলীয় কর্মীকে প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করা হয় এবং ভোটকেন্দ্রের ভেতরেই ব্যালট বাক্সে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। এই ব্যাপক অশান্তি ও ভোট লুঠের ঘটনা পাকিস্তানের পরিচালিত এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
PoK-এ রক্তক্ষয়ী নির্বাচন: কোটলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু কর্মীর
সবচেয়ে ভয়াবহ এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটেছে কোটলি জেলার 'LA-9 কোটলি-II' নির্বাচন কেন্দ্রে। সেখানে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (PPP) এবং পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (PML-N)-এর সমর্থকদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ বাঁধে।
PPP-র অভিযোগ, PML-N প্রার্থীর সমর্থকরা বুথ দখল করার উদ্দেশ্যে আচমকা এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে। এই গুলিবৃষ্টির মধ্যেই মুখতার ইউনুস নামে পিপিপি-র এক অত্যন্ত সক্রিয় কর্মীর ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। এছাড়াও, সংঘর্ষে আরও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এই ঘটনার পর কোটলি সহ সংলগ্ন এলাকাগুলিতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীকে রীতিমতো কালঘাম ছোটাতে হয়।
ভাইরাল ভিডিও: ব্যালট লুঠ ও অগ্নিসংযোগ
সহিংসতা শুধু কোটলিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভিম্বার জেলার সামাহনি তেহসিল থেকেও চরম অরাজকতার ছবি ও ভিডিও সামনে এসেছে। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, একদল উন্মত্ত সমর্থক জোরপূর্বক ভোটকেন্দ্রে ঢুকে পড়ে ব্যালট বাক্স লুঠ করছে এবং সবার চোখের সামনে একটি ব্যালট বাক্সে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে।
এই চরম নৈরাজ্যের ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন সম্পূর্ণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ। যদিও পরবর্তীকালে পুলিশ অন্তত ৩০ জন উপদ্রবীকে আটক করেছে, তবে ততক্ষণে নির্বাচন প্রক্রিয়ার চরম অবমাননা হয়ে গেছে।
রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও বিলওয়াল ভুট্টো-জারদারির ক্ষোভ
আশ্চর্যজনকভাবে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজধানী ইসলামাবাদে PML-N এবং PPP জোটবদ্ধভাবে সরকার চালালেও, PoK-এর নির্বাচনে এই দুই দল পরস্পরের প্রবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে। কোটলিতে দলীয় কর্মী খুনের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পিপিপি চেয়ারম্যান বিলওয়াল ভুট্টো-জারদারি।
"স্থানীয় প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তারা ভোটারদের নিরাপত্তা দিতে এবং হিংসা ঠেকাতে সম্পূর্ণ অপারগ।"
- বিলওয়াল ভুট্টো-জারদারি (চেয়ারম্যান, পিপিপি)
উভয় দলই একে অপরের বিরুদ্ধে জাল ভোটদান (Bogus voting) এবং ভোটারদের ভয় দেখানোর অভিযোগ এনেছে।
ফাঁকা পোলিং বুথ এবং সাধারণ মানুষের অনীহা
দ্য হিন্দু (The Hindu) এবং এপি নিউজ (AP News)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মতে, পিওকে (PoK)-এর সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে এই নির্বাচন নিয়ে কোনো উৎসাহ নেই। স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীদের মতে, আগে থেকেই এই নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এবং আইএসআই (ISI) দ্বারা নির্ধারিত হয়ে আছে বলে স্থানীয়রা মনে করেন। প্রথম দফার নির্বাচনে অনেক পোলিং বুথ প্রায় খাঁ-খাঁ করছিল, যা প্রমাণ করে যে পিওকে-র সাধারণ মানুষ পাকিস্তানের এই 'ফেক ইলেকশন' বা ভুয়ো নির্বাচনী নাটককে কার্যত বয়কট করেছেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভারতের অবস্থান
ভারত শুরু থেকেই পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে পাকিস্তানের এই ধরনের নির্বাচন এবং অবৈধ দখলের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। পিআইবি (PIB) এবং ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের (MEA) পুরনো বিবৃতি অনুযায়ী, ভারত সরকার বারবার স্পষ্ট করেছে যে, "পাকিস্তান-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, আছে এবং থাকবে। এই ধরনের ভুয়ো নির্বাচন করে পাকিস্তান সেখানে তাদের অবৈধ দখলদারিকে আইনি মান্যতা দিতে পারবে না।"
সোমবারের এই হিংসার ঘটনা ভারতের সেই দাবিকেই আরও জোরালো করেছে যে, পিওকে-তে কোনো প্রকৃত গণতন্ত্র বা আইনের শাসন নেই। আন্তর্জাতিক স্তরেও, মানবাধিকার সংগঠনগুলি পিওকে-তে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক নেতাদের ওপর দমন-পীড়ন এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ তুলে পাকিস্তানের তীব্র সমালোচনা করেছে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের (PoK) নির্বাচনে কী ঘটেছে?
PoK-এর প্রথম দফার বিধানসভা নির্বাচনে ব্যাপক হিংসা, ব্যালট বাক্স লুঠ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। কোটলি জেলায় সংঘর্ষের জেরে এক রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে।
২. কোটলি জেলায় কোন রাজনৈতিক দলের কর্মীর মৃত্যু হয়েছে?
কোটলি জেলায় পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (PML-N) এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টি (PPP)-র সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে মুখতার ইউনুস নামে এক পিপিপি (PPP) কর্মীর মৃত্যু হয়েছে।
৩. পিওকে (PoK) নির্বাচন নিয়ে ভারতের অবস্থান কী?
ভারত শুরু থেকেই এই নির্বাচনের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মতে, পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সেখানে পাকিস্তানের এই 'ভুয়ো নির্বাচন' বেআইনি।