অকল্যান্ড: ভারত ও নিউজিল্যান্ডের পারস্পরিক সম্পর্ক কি এবার এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে চলেছে? দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হতে চলা 'মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি' বা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (Free Trade Agreement) কি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্পূর্ণ সমীকরণ বদলে দেবে? দীর্ঘ ৪০ বছর পর কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই নিউজিল্যান্ড সফর ঘিরে এখন এমনই একাধিক প্রশ্ন এবং বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও বাণিজ্যে নতুন গতি
দুই দিনের ঐতিহাসিক সফরে নিউজিল্যান্ডে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রায় চার দশক পর কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দুই দেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক বড়সড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে সশরীরে স্বাগত জানান সেদেশের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন (Christopher Luxon)। শনিবার দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, বিনিয়োগ এবং নতুন প্রযুক্তির মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এই সফরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (FTA) বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হওয়া। চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই দুই দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। এবার মোদীর সফরে এর আনুষ্ঠানিক প্রয়োগের রূপরেখা চূড়ান্ত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের বাণিজ্য নতুন গতি পাবে। নিউজিল্যান্ড থেকে ভারতে আমদানি করা প্রায় ৯৫ শতাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক হয় পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে, নতুবা অনেকটাই কমানো হবে। অন্যদিকে, ভারত থেকে নিউজিল্যান্ডে রপ্তানি করা ১০০ শতাংশ পণ্যের ওপরই ট্যারিফ বা শুল্ক সম্পূর্ণ বাতিল করা হবে। এর ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা সরাসরি লাভবান হবেন এবং নিউজিল্যান্ডের বাজারে ভারতীয় পণ্য অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
কৃষকদের স্বার্থরক্ষা ও নিউজিল্যান্ডের লক্ষ্যমাত্রা
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হলেও ভারত সরকার নিজস্ব কৃষকদের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে ডেইরি পণ্য (দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য), চিনি, আপেল এবং কিছু সংবেদনশীল কৃষিপণ্যকে এই চুক্তির আওতার বাইরে রেখেছে। এর ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ কৃষি ও ডেইরি শিল্পে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। অন্যদিকে, নিউজিল্যান্ডও এই চুক্তি নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী। ১.৪ বিলিয়ন জনসংখ্যার বিশাল ভারতীয় বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়িয়ে ২০৩৪ সালের মধ্যে নিজেদের রপ্তানি মূল্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে তারা। বিশেষ করে নিউজিল্যান্ডের ওয়াইন শিল্প এবং প্রাথমিক পরিষেবাগুলি ভারতে নতুন বাজার পাবে।
ক্রীড়া, প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা চুক্তি
বাণিজ্যের পাশাপাশি কৌশলগত অংশীদারিত্বেও জোর দিচ্ছে দুই দেশ। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় (Indo-Pacific) অঞ্চলে একটি অবাধ, উন্মুক্ত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সামুদ্রিক অঞ্চল বজায় রাখার উদ্দেশ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও তথ্য আদান-প্রদান সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে স্বাক্ষর হতে পারে।
এছাড়াও, অলিম্পিক এবং আন্তর্জাতিক স্তরে নিউজিল্যান্ডের দুর্দান্ত ক্রীড়া সাফল্যের কথা মাথায় রেখে ভারত স্পোর্টস সায়েন্স, স্পোর্টস মেডিসিন, অ্যাথলিট প্রশিক্ষণ এবং কোচিংয়ের ক্ষেত্রেও নিউজিল্যান্ডের সাথে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। এর ফলে ভারতীয় ক্রীড়াবিদরা বিশ্বমানের প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণের সুবিধা পাবেন। শিক্ষা, পর্যটন এবং ছাত্র বিনিময় (Student Exchange) কর্মসূচি নিয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। সমাজমাধ্যমে ক্রিস্টোফার লাক্সনকে উষ্ণ অভ্যর্থনার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। পালটা বার্তায় লাক্সন ভারতকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছেন, এই সফর শুধু দুই দেশের সম্পর্ক বৃদ্ধি নয়, বরং এক নতুন সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার অংশীদারিত্বের উৎসব।
প্রধানমন্ত্রী মোদীর নিউজিল্যান্ড সফর (FAQ)
প্রশ্ন ১: ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে কোন গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে চলেছে?
উত্তর: দুই দেশের মধ্যে 'মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি' বা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (FTA) বাস্তবায়িত হতে চলেছে, যার ফলে ভারতে নিউজিল্যান্ডের পণ্য এবং নিউজিল্যান্ডে ভারতীয় পণ্যের শুল্ক ব্যাপকভাবে কমানো হবে।
প্রশ্ন ২: এই চুক্তিতে ভারতীয় কৃষকদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
উত্তর: ভারতীয় কৃষকদের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে দুধ, দুগ্ধজাত দ্রব্য, চিনি, আপেল এবং বেশ কিছু সংবেদনশীল কৃষিপণ্যকে এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।