নিট বিতর্কের পর বড় পদক্ষেপ! পরীক্ষা ব্যবস্থার খোলনলচে বদলাতে নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে ‘হাই-পাওয়ার্ড টাস্ক ফোর্স’ ঘোষণা মোদীর

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং নন্দন নিলেকানির ছবি, নিট পরীক্ষা সংস্কার টাস্ক ফোর্স গঠন
নিট বিতর্কের জেরে পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফেরাতে নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে টাস্ক ফোর্স গঠন করল কেন্দ্র। (ছবি: সংগৃহীত)


নয়াদিল্লি: দেশজুড়ে নিট (NEET-UG) এবং ইউজিসি-নেট (UGC-NET) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং দুর্নীতির অভিযোগে যখন উত্তাল গোটা দেশ, ঠিক তখনই পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফেরাতে বড় ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দেশের পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত, নির্ভরযোগ্য এবং প্রযুক্তি-নির্ভর করে তুলতে ইনফোসিস (Infosys)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ‘আধার’ (Aadhaar)-এর রূপকার নন্দন নিলেকানির (Nandan Nilekani) নেতৃত্বে একটি ‘হাই-পাওয়ার্ড টাস্ক ফোর্স’ (High-Powered Task Force) গঠনের কথা ঘোষণা করল কেন্দ্র。

রবিবার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’ (X) এবং ইনস্টাগ্রামে একটি বিশেষ ভিডিও বার্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা দেশবাসীকে জানান।

কেন এই টাস্ক ফোর্স? নিট বিতর্কের প্রেক্ষাপট

বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ (NTA)-র চরম অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে দিল্লির যন্তর মন্তর সহ গোটা দেশে তীব্র ছাত্র বিক্ষোভ দেখা যায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, টানা ৩৫ দিনের বিক্ষোভের জেরে অবশেষে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন ধর্মেন্দ্র প্রধান। তাঁর পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন প্রহ্লাদ জোশী।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের টাইমলাইন

ঘটনা প্রেক্ষাপট
নিট-ইউজি পরীক্ষা বিতর্ক প্রশ্নফাঁস ও গ্রেস মার্কস নিয়ে দেশজুড়ে ছাত্র বিক্ষোভ।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ তীব্র চাপের মুখে ইস্তফা দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান, নতুন মন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশী।
এনটিএ-র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গাফিলতির অভিযোগে অন্তত ৪৭ জন কর্মীকে বরখাস্ত।
টাস্ক ফোর্স গঠন নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে পরীক্ষা সংস্কার কমিটি ঘোষণা।

প্রধানমন্ত্রীর কড়া বার্তা: "শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বরদাস্ত নয়"

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভিডিও বার্তায় অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানিয়েছেন যে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন:

"ভারত সরকার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। যারা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে, তারা আজ জেলে পচছে। আমরা ইতিমধ্যেই ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট তৈরি করেছি। আমাদের ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হবে। আমাদের পরীক্ষা ব্যবস্থাকে হতে হবে নির্ভরযোগ্য এবং স্বচ্ছ, যেখানে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার থাকবে।"

এই বিষয়গুলি মাথায় রেখেই বিশ্ববিখ্যাত প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে এই হাই-পাওয়ার্ড টাস্ক ফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নন্দন নিলেকানি কেন? টাস্ক ফোর্সে আর কারা আছেন?

নন্দন নিলেকানিকে এই গুরুদায়িত্ব দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো তাঁর ঈর্ষণীয় প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা। তিনি ভারতের আইটি সেক্টরের অন্যতম পথিকৃৎ এবং ‘আধার’ ব্যবস্থার প্রণেতা। সরকার এবার সেই একই ধাঁচে পরীক্ষা ব্যবস্থাকেও একটি হ্যাক-প্রুফ (Hack-proof) বা অভেদ্য ডিজিটাল দুর্গে পরিণত করতে চাইছে। নিলেকানির পাশাপাশি এই কমিটিতে রয়েছেন:

  • এস. সোমনাথ (S. Somanath): ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো (ISRO)-র প্রাক্তন চেয়ারম্যান।
  • তপন ডেকা (Tapan Deka): ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (IB)-র প্রাক্তন ডিরেক্টর।
  • ভি. কামাকোটি (V. Kamakoti): আইআইটি মাদ্রাজ (IIT Madras)-এর ডিরেক্টর।
  • অনিতা করোয়াল (Anita Karwal): স্কুল শিক্ষা ও সাক্ষরতা দফতরের প্রাক্তন সচিব।
  • অমৃত লাল মীনা (Amrit Lal Meena): উচ্চশিক্ষা সচিব এবং লজিস্টিক বিশেষজ্ঞ।

সংসদে আসছে নতুন আইন ও ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট

শুধু টাস্ক ফোর্স গঠনই নয়, আইনি দিক থেকেও কঠোর হচ্ছে মোদী সরকার। আগামী সোমবারই সংসদে ‘পাবলিক এক্সামিনেশনস (প্রিভেনশন অফ আনফেয়ার মিনস) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ পেশ হতে চলেছে। এই নতুন বিলে বেশ কিছু কড়া সংশোধনী আনা হয়েছে:

  1. নির্দিষ্ট সময়ের তদন্ত: প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত যে কোনো তদন্ত সর্বোচ্চ দুই মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে।
  2. ফাস্ট-ট্র্যাক বিচার: চার্জশিট পেশের তিন মাসের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
  3. কঠোর শাস্তি ও জরিমানা: সংগঠিত চক্রের দোষ প্রমাণিত হলে বিপুল অঙ্কের জরিমানা এবং দীর্ঘমেয়াদী কারাবাস।
  4. স্পেশাল টাস্ক ফোর্স: আন্তঃরাজ্য দুর্নীতি দমনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা।

আগামী দিনের দিশা

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলির মতে, ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ এই পরীক্ষাগুলির সঙ্গে যুক্ত। নতুন শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশীর কাঁধে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার্থীদের হারানো বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা। আগামী ২০২৭ সাল থেকে নিট-এর মতো পরীক্ষাগুলি সম্পূর্ণ কম্পিউটার-ভিত্তিক (CBT) এবং ত্রুটিমুক্ত করার যে পরিকল্পনা সরকার নিয়েছে, তা বাস্তবায়নে এই টাস্ক ফোর্সের ভূমিকা হবে নির্ণায়ক।

নিট বিতর্ক ও টাস্ক ফোর্স নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে গঠিত টাস্ক ফোর্সের কাজ কী?

এই টাস্ক ফোর্সের মূল কাজ হলো ভারতের পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থা (যেমন NEET, NET) পর্যালোচনা করা এবং এনটিএ (NTA)-র পরিকাঠামোগত সংস্কার করে একটি সম্পূর্ণ হ্যাক-প্রুফ ও ত্রুটিমুক্ত ডিজিটাল পরীক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা।

২. নিট বিতর্কের পর নতুন শিক্ষামন্ত্রী কে হয়েছেন?

ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার পর ভারতের নতুন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন প্রহ্লাদ জোশী।

৩. পাবলিক এক্সামিনেশনস অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২৬-এর মূল উদ্দেশ্য কী?

প্রশ্নফাঁস চক্রের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া। এই বিলে দোষীদের বিপুল জরিমানা, দীর্ঘমেয়াদী কারাবাস এবং ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্টে দ্রুত বিচারের বিধান রাখা হয়েছে।

Sangbad Ekalavya Digital Desk

প্রতিদিনের ব্রেকিং নিউজ থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি এবং স্থানীয় সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ খবর তুলে আনে সংবাদ একলব্য ডিজিটাল ডেস্ক।

editor@sangbadekalavya.in