কোয়েটা, পাকিস্তান: পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বালুচিস্তানের (Balochistan) একটি কয়লা খনিতে ভয়াবহ মিথেন গ্যাস বিস্ফোরণের (Coal Mine Blast) জেরে অন্তত ১৮ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় খনির ভেতর আরও বহু শ্রমিক আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার, ৩০শে জুলাই ২০২৬ তারিখে কোয়েটার উপকণ্ঠে অবস্থিত সোরঞ্জ (Sorange) এলাকার একটি খনিতে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
কীভাবে ঘটল এই দুর্ঘটনা?
বালুচিস্তানের চিফ ইনস্পেক্টর অফ মাইনস (Chief Inspector of Mines) আব্দুল ঘানি বালোচ এবং মুহাম্মদ আতিফের বক্তব্য অনুযায়ী, সোরঞ্জ এলাকার 'সর্দার উসমান লিজ' (Sardar Usman Lease) নামক কয়লা খনিটির দুটি অংশে এই বিস্ফোরণ ঘটে। খনির প্রায় ৪,০০০ ফুট গভীরে মিথেন গ্যাস (Methane Gas) জমে যাওয়ার ফলে এই শক্তিশালী বিস্ফোরণটি হয় এবং খনির একটি বড় অংশ ধসে পড়ে।
বিস্ফোরণের সময় খনির ওই অংশে অন্তত ৩৬ থেকে ৪২ জন শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। দুর্ঘটনার পরপরই প্রাদেশিক বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ (PDMA) এবং অন্যান্য উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছয়।
উদ্ধারকার্য ও হতাহতের সংখ্যা
প্রাথমিকভাবে সাতটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। এরপর রাতভর এবং শুক্রবার সকাল পর্যন্ত চলা উদ্ধারকার্যে আরও মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৮-তে দাঁড়িয়েছে।
"আমরা এখনও আশা করছি হয়তো কয়েকজনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে পারব, তবে সেই সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।"
- মুহাম্মদ আতিফ (উদ্ধারকারী আধিকারিক)
বিশেষজ্ঞদের মতে, মিথেন গ্যাস বিস্ফোরণের পর খনির ভেতর অক্সিজেনের মাত্রা শূন্যে নেমে আসে, যার ফলে আটকে পড়া শ্রমিকদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত কমে যায়। এছাড়া উদ্ধারকারী দলগুলিকেও ধসে পড়া পাথর সরিয়ে এবং গ্যাস থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রেখে অত্যন্ত সাবধানে এগোতে হচ্ছে।
সরকারি পদক্ষেপ ও আর্থিক সাহায্য
বালুচিস্তানের খনি ও খনিজ উন্নয়ন মন্ত্রী শোয়েব নোশেরওয়ানি এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী মীর সরফরাজ বুগতির নির্দেশে উদ্ধারকার্য ত্বরান্বিত করা হয়েছে। নিহত শ্রমিকদের পরিবার পিছু ৫ লক্ষ পাকিস্তানি রুপি (প্রায় ১,৮০০ মার্কিন ডলার) ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে প্রাদেশিক সরকার। একইসঙ্গে এই বিস্ফোরণের কারণ খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিনের অবহেলা ও শ্রমিকদের ক্ষোভ
পাকিস্তানের, বিশেষ করে বালুচিস্তানের কয়লা খনিগুলোতে দুর্ঘটনার হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। শ্রমিক ইউনিয়ন 'পাকিস্তান সেন্ট্রাল মাইনস লেবার ফেডারেশন'-এর (Pakistan Central Mines Labour Federation) অভিযোগ, মালিকপক্ষের চরম অবহেলা এবং নিরাপত্তা বিধির তোয়াক্কা না করার জন্যই বারবার এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে।
খনিগুলোতে উপযুক্ত ভেন্টিলেশন বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা এবং আধুনিক গ্যাস ডিটেক্টর (Gas detection systems) না থাকা সত্ত্বেও শ্রমিকদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। তীব্র বেকারত্ব এবং দারিদ্র্যের কারণে হাজার হাজার মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশাকেই জীবিকা হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হন। চলতি বছরেই এর আগে মার্চ ও এপ্রিলে বালুচিস্তানের দুকি (Duki) এবং দেগারি (Degari) এলাকার খনিতে বিষাক্ত গ্যাসের কারণে যথাক্রমে দুই ও তিন জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। বারবার এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি পাকিস্তানের খনি শিল্পের নিরাপত্তা পরিকাঠামো নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরেও বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. পাকিস্তানের কোথায় খনি দুর্ঘটনাটি ঘটেছে?
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বালুচিস্তানের কোয়েটার উপকণ্ঠে অবস্থিত সোরঞ্জ এলাকার একটি কয়লা খনিতে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে।
২. এই কয়লা খনিতে বিস্ফোরণের কারণ কী?
খনির প্রায় ৪,০০০ ফুট গভীরে মিথেন গ্যাস (Methane Gas) জমে যাওয়ার কারণে এই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে এবং খনির একাংশ ধসে পড়ে।
৩. দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে কত টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়া হচ্ছে?
বালুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের তরফে নিহত শ্রমিকদের পরিবার পিছু ৫ লক্ষ পাকিস্তানি রুপি (প্রায় ১,৮০০ মার্কিন ডলার) ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।