পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক (PNB)-এর প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকা) ঋণখেলাপি এবং আর্থিক তছরুপের মামলায় অভিযুক্ত পলাতক হিরে ব্যবসায়ী নীরব মোদীর (Nirav Modi) প্রত্যর্পণে ক্রমাগত বিলম্ব নিয়ে এবার সরব হলেন খোদ ব্রিটেনের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল (Priti Patel)। নিজের দেশের আইনি ব্যবস্থা এবং সরকারের সমালোচনা করে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, নীরব মোদীর মতো হাই-প্রোফাইল অপরাধীকে এখনও ব্রিটেনে রেখে দেওয়া ব্রিটিশ করদাতাদের জন্য চূড়ান্ত অবমাননাকর এবং এতে ভারত-ব্রিটেন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে গভীর প্রভাব পড়ছে।
নীরব মোদীর প্রত্যর্পণে দেরি কেন? ক্ষুব্ধ প্রাক্তন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
জানা গেছে, সম্প্রতি 'দ্য ডায়মন্ড কিং' (The Diamond King) নামক একটি পডকাস্টে অংশ নিয়ে প্রীতি প্যাটেল নীরব মোদী প্রত্যর্পণ মামলা নিয়ে একাধিক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। ২০২১ সালের এপ্রিলে ব্রিটেনের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রীতি প্যাটেলই নীরব মোদীকে ভারতে প্রত্যর্পণের ফাইলে সই করেছিলেন। কিন্তু আড়াই বছর কেটে যাওয়ার পরেও সেই নির্দেশ কার্যকর না হওয়ায় তিনি তীব্র হতাশা ব্যক্ত করেছেন।
"আমি অত্যন্ত বিস্মিত এবং হতাশ যে নীরব মোদী এখনও ব্রিটেনে বসে আছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এতদিনে ওর ভারতের জেলে বসে সাজা খাটার কথা ছিল। আমাদের আইনি ব্যবস্থার ফাঁকফোকর এবং নানা অজুহাতের কারণে এই মামলাটি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এটি ব্রিটিশ আইনি ব্যবস্থার চরম অপব্যবহার এবং ব্রিটেনের সাধারণ করদাতাদের অর্থের চূড়ান্ত অপচয়।"
- প্রীতি প্যাটেল (প্রাক্তন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)
বিবিসি (BBC)-র তথ্য অনুযায়ী, মানবাধিকার এবং জেলের পরিবেশের দোহাই দিয়ে নীরব মোদীর আইনজীবীরা ব্রিটেনের একাধিক আদালতে আবেদন করেছেন, যার ফলে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া বারবার হোঁচট খেয়েছে।
ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব পড়ছে
নীরব মোদীর মতো আর্থিক অপরাধীদের প্রত্যর্পণে বিলম্ব ভারত ও ব্রিটেনের কূটনৈতিক সম্পর্কে কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তারও একটি চিত্র তুলে ধরেছেন প্রীতি প্যাটেল। তিনি জানান, ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তাঁর কার্যকালে এই একটি মাত্র বিষয়ের জন্য দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক কূটনৈতিক টানাপোড়েন ছিল। ভারত সরকার ব্রিটেনের এই ঢিলেঢালা মনোভাব নিয়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গাটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পিআইবি (PIB) এবং ভারতের বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে আগেই জানানো হয়েছিল যে, আর্থিক অপরাধীদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারত সরকার বদ্ধপরিকর।
নীরব মোদীর বিরুদ্ধে ভারতের কী কী অভিযোগ রয়েছে?
৫৫ বছর বয়সী 'ডায়মন্ড কিং' নীরব মোদী বর্তমানে লন্ডনের কুখ্যাত পেন্টনভিল জেলে (Pentonville Prison) বন্দি রয়েছেন। ভারতে তাঁর বিরুদ্ধে মূলত তিনটি বড় অভিযোগ রয়েছে:
- সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (CBI)-এর দায়ের করা PNB জালিয়াতির মামলা।
- এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর দায়ের করা মানি লন্ডারিং (Money Laundering) বা আর্থিক তছরুপের মামলা।
- প্রমাণ লোপাট এবং সাক্ষীদের প্রভাবিত করার চেষ্টা।
রয়টার্স (Reuters)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্রিটেনের আদালতে নীরব মোদীর আইনি লড়াইয়ের প্রায় সব রাস্তাই এখন বন্ধ হয়ে এসেছে। এমনকী ইউরোপিয়ান কোর্ট অফ হিউম্যান রাইটস (ECHR)-এর কাছে তিনি যে আবেদন করেছিলেন, সেখান থেকেও কোনও স্বস্তি পাননি তিনি। ফলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নীরব মোদীর ভারত প্রত্যর্পণের 'কাউন্টডাউন' বা উলটোগুনতি অবশেষে শুরু হয়ে গেছে।
ব্রিটেনের মাটিতে বসে ভারতীয় অপরাধীদের আইনি সুবিধা নেওয়ার এই প্রবণতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও সমালোচনা শুরু হয়েছে। এপি নিউজ (AP News)-এর মতে, লন্ডন দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের নানা প্রান্তের পলাতক ধনকুবেরদের কাছে একটি 'নিরাপদ স্বর্গ' (Safe Haven) হয়ে উঠেছে। বিজয় মালিয়া (Vijay Mallya) এবং নীরব মোদীর মতো হাই-প্রোফাইল মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে ভবিষ্যতে ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুগে ভারতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) স্বাক্ষরের ক্ষেত্রেও ব্রিটেনকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. প্রীতি প্যাটেল নীরব মোদী সম্পর্কে কী বলেছেন?
ব্রিটেনের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, নীরব মোদীর মতো অপরাধীর এতদিনে ভারতের জেলে থাকা উচিত ছিল। প্রত্যর্পণে বিলম্ব হওয়াটা ব্রিটিশ আইনি ব্যবস্থার অপব্যবহার।
২. নীরব মোদী বর্তমানে কোথায় বন্দি রয়েছেন?
নীরব মোদী বর্তমানে লন্ডনের কুখ্যাত পেন্টনভিল জেলে (Pentonville Prison) বন্দি রয়েছেন।
৩. নীরব মোদীর বিরুদ্ধে ভারতে কী কী অভিযোগ রয়েছে?
নীরব মোদীর বিরুদ্ধে মূলত পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক (PNB)-এর প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপি, আর্থিক তছরুপ (CBI ও ED মামলা) এবং প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ রয়েছে।