কাঠমান্ডু/জনকপুর: নেপালের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা এবং হিংসার ঘটনা সামনে এল। শ্রাবণ মাসের পবিত্র কাঁওয়ার যাত্রার (Kanwar Yatra) সময় শুরু হওয়া এক তুচ্ছ বচসা ধীরে ধীরে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। হিংসার বলি হয়েছেন এক ১৯ বছর বয়সি যুবক। পরিস্থিতি ক্রমশ হাতের বাইরে চলে যাওয়ায় নেপাল প্রশাসন বাধ্য হয়ে ভারতের সীমান্তবর্তী তিনটি প্রধান জেলা—জনকপুর (Janakpur), সিরাহা (Siraha) এবং সপ্তরী (Saptari)-তে অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্ফু (Curfew) জারি করেছে।
কীভাবে শুরু হলো এই গোষ্ঠী সংঘর্ষ?
প্রশাসনের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয় গত রবিবার রাতে, নেপালের সুনসরি (Sunsari) জেলার দেওয়ানগঞ্জ গ্রামীণ পৌরসভার কাপ্তানগঞ্জ এলাকায়। শ্রাবণ মাসে নেপালেও বহু শিব ভক্ত 'কাঁওয়ার যাত্রা' করে থাকেন। এই যাত্রার সময় দুটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে বচসা শুরু হয়।
সামান্য এই বচসা দ্রুতই সোশ্যাল মিডিয়া এবং অন্যান্য মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং সমগ্র মাদেশ প্রদেশে (Madhesh Province) তা হিংসাত্মক রূপ নেয়। দেখতে দেখতে সুনসরি থেকে এই হিংসার আগুন ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবেশী জেলা সপ্তরী, সিরাহা এবং প্রাদেশিক রাজধানী জনকপুরে।
সিরাহা জেলায় ভয়াবহ হিংসা ও যুবকের মৃত্যু
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় সিরাহা জেলায়। সেখানকার গোলবাজার (Golbazar) এলাকায় উন্মত্ত বিক্ষোভকারীরা প্রকাশ্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অন্তত ১১টি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ব্যাপক ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের জেরে এলাকায় প্রবল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এই হিংসাত্মক পরিবেশের মধ্যেই গণেশ যাদব (Ganesh Yadav) নামে ১৯ বছরের এক যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে ওঠে। এছাড়া, পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে বহু সাধারণ মানুষ এবং বিক্ষোভকারী গুরুতর জখম হয়েছেন বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কড়া পদক্ষেপ
বিক্ষোভ এবং দাঙ্গা দমনে নেপাল পুলিশ প্রথমে কাঁদানে গ্যাসের শেল (Tear gas) ফাটায়। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায়, লাহানের মতো উত্তেজনাপ্রবণ এলাকায় পুলিশ বাধ্য হয়ে শূন্যে গুলি (Warning shots/Aerial firing) ছোড়ে।
প্রশাসনের তরফ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, দাঙ্গা, ভাঙচুর বা সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করলে কাউকেই রেয়াত করা হবে না। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে পুলিশ।
জনকপুর ও অন্যান্য স্থানে কার্ফু জারি
মাদেশ প্রদেশের রাজধানী জনকপুরেও দাঙ্গার আঁচ এসে পৌঁছায়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থান এই জনকপুর উপমহানগরে বৃহস্পতিবার দুপুর ৩:৩০ থেকে কড়া কার্ফু জারি করা হয়। চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার (CDO) প্রেম প্রসাদ লুইটেলের নির্দেশ অনুযায়ী নিম্নলিখিত এলাকাগুলিতে সম্পূর্ণ কার্ফু বলবৎ থাকবে:
- জনকপুর উপমহানগর (Janakpur Sub-Metropolitan City)
- লক্ষ্মিনিয়া গ্রামীণ পৌরসভা (Laxminiya)
- নাগারাইন পৌরসভা (Nagarain)
ভারত-নেপাল সীমান্তবর্তী এই এলাকাগুলিতে কার্ফু জারি হওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ভারত-নেপাল সীমান্তে প্রভাব ও বর্তমান পরিস্থিতি
নেপালের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ভারতের জন্যও উদ্বেগের, কারণ সিরাহা, জনকপুর এবং সপ্তরী—এই তিনটি জেলাই বিহার সংলগ্ন ভারতীয় সীমান্তের একেবারে কাছে অবস্থিত। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা এসএসবি (SSB)-কেও এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে যাতে নেপালের দিক থেকে কোনো দুষ্কৃতী ভারতে প্রবেশ করতে না পারে।
নেপাল সরকারের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যাতে দেশের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করা। স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ এবং আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশাসন স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে আবেদন জানিয়েছে যে, তাঁরা যেন গুজবে কান না দেন এবং শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনকে সাহায্য করেন। এখন দেখার বিষয়, কবে এই উত্তেজনা প্রশমিত হয় এবং মাদেশ প্রদেশের জনজীবন পুনরায় স্বাভাবিক ছন্দে ফেরে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. নেপালে কেন কার্ফু জারি করা হয়েছে?
শ্রাবণ মাসের কাঁওয়ার যাত্রাকে কেন্দ্র করে দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে গোষ্ঠী সংঘর্ষ এবং হিংসা ছড়িয়ে পড়ায় নেপালের তিনটি জেলায় কার্ফু জারি করা হয়েছে।
২. নেপালের কোন কোন জেলায় কার্ফু চলছে?
মূলত ভারতের সীমান্তবর্তী জনকপুর, সিরাহা এবং সপ্তরী— এই তিনটি জেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্ফু জারি করা হয়েছে।
৩. এই দাঙ্গার প্রভাব কি ভারতে পড়বে?
দাঙ্গাকবলিত জেলাগুলো বিহার সংলগ্ন ভারতীয় সীমান্তের কাছে হওয়ায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা এসএসবি (SSB)-কে হাই-অ্যালার্টে রাখা হয়েছে।