বিমানবন্দরে মিলল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৩০০টি তাজা বোমা! ইউরোপের মেগা প্রজেক্ট ঘিরে তুমুল শোরগোল

এথেন্স (গ্রিস): গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের উপকণ্ঠে ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম আরবান রিডেভেলপমেন্ট (শহর পুনর্নির্মাণ) প্রকল্প 'দ্য এলিনিকন' (The Ellinikon)-এর কাজ চলাকালীন মাটির তলা থেকে উঠে এল এক ভয়ংকর ইতিহাস। প্রাক্তন এথেন্স আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (Athens International Airport) মাটি খুঁড়তেই উদ্ধার হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (WWII) আমলের প্রায় ৩০০টি তাজা বা অবিস্ফোরিত বোমা (Unexploded Bombs) এবং কয়েকশো টন বিষাক্ত বর্জ্য! এই ঘটনায় ইউরোপ জুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

কোথা থেকে এল এত বোমা? (ইতিহাসের পাতা থেকে)

যে ৬২০ হেক্টর জমির ওপর বর্তমানে এই 'দ্য এলিনিকন' প্রজেক্ট চলছে, সেটি ১৯৩৮ সালের আগে 'হাসানি' (Hasani) নামের একটি শান্ত কৃষিক্ষেত্র ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, যখন গ্রিস নাৎসি জার্মানির (Nazi Germany) দখলে চলে যায়, তখন এই এলাকাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বিমানঘাঁটিতে পরিণত হয়।

জার্মানদের দখলদারির সময়, মিত্রবাহিনী (Allied Forces) এই বিমানঘাঁটি ধ্বংস করতে লাগাতার ও ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছিল। সেই সময় হাজার হাজার বোমা বর্ষণ করা হলেও, তার একটি বড় অংশ মাটিতে গেঁথে যায় এবং অবিস্ফোরিত থেকে যায়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেই জায়গাতেই এথেন্সের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গড়ে ওঠে এবং ২০০১ সাল পর্যন্ত সেটি চালু ছিল। কিন্তু দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সেই মাটির নিচেই যে ৩০০টি তাজা বোমা লুকিয়ে ছিল, তা কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি!

উদ্ধারকার্য ও গ্রিক সেনার রুদ্ধশ্বাস অপারেশন

সম্প্রতি এই এলাকায় নিকাশি ব্যবস্থা, জলের লাইন এবং নতুন পরিকাঠামো তৈরির জন্য মাটি খোঁড়ার কাজ শুরু হলে একে একে এই বোমাগুলি বের হতে থাকে। পরিস্থিতি ভয়াবহ বুঝতে পেরে অবিলম্বে গ্রিক সেনার 'এক্সপার্ট এক্সপ্লোসিভ অর্ডন্যান্স ডিসপোজাল ইউনিট' বা টেনক্স (TENX)-কে তলব করা হয়।

সেনাবাহিনী অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মাটির গভীর থেকে একে একে প্রায় ৩০০টি অবিস্ফোরিত বোমা উদ্ধার করে। এই বোমাগুলি এতটাই বিপজ্জনক অবস্থায় ছিল যে, সামান্য অসতর্কতায় বড়সড় বিস্ফোরণ ঘটতে পারত। সেনার বিশেষ দল নিরাপদ স্থানে নিয়ে গিয়ে সমস্ত বোমাকে নিষ্ক্রিয় (Defused) করেছে।

২৭০ টন বিষাক্ত জ্বালানি ও রাসায়নিক বর্জ্য উদ্ধার!

বোমার চেয়েও কম ভয়ংকর নয় মাটির তলা থেকে পাওয়া বিষাক্ত বর্জ্যের পাহাড়। 'লামডা ডেভেলপমেন্ট' (Lamda Development) নামক যে সংস্থা এই প্রজেক্টের দায়িত্বে রয়েছে, তারা জানিয়েছে যে, বিমানবন্দর চলাকালীন আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যাঙ্ক এবং পাইপলাইন থেকে বছরের পর বছর ধরে জেট ফুয়েল, ডিজেল এবং গ্যাসোলিন লিক করে মাটির গভীরে ও ভূগর্ভস্থ জলে মিশে গিয়েছিল। মাটি শোধন করতে গিয়ে এখনও পর্যন্ত প্রায় ২৭০ টন বিষাক্ত তৈলাক্ত বর্জ্য এবং অ্যাসবেসটস (Asbestos) উদ্ধার করা হয়েছে।

ভবিষ্যতের এথেন্স: কীভাবে শোধন হচ্ছে মাটি?

এই বিশাল এলাকাকে মানুষের বসবাসের উপযোগী এবং সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত করতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • সয়েল ভ্যাপার এক্সট্র্যাকশন (Soil Vapor Extraction)
  • ইন-সিটু বায়োলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট (In-situ biological treatment)
  • অ্যাক্টিভেটেড কার্বন ফিলট্রেশন এবং কেমিক্যাল অক্সিডেশন

এই উন্নত পদ্ধতিগুলির সাহায্যে ভূগর্ভস্থ জল এবং মাটিকে সম্পূর্ণভাবে পরিশোধন করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া বিষাক্ত বর্জ্যগুলিকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিশেষ প্ল্যান্টে নিয়ে গিয়ে নিরাপদে নষ্ট করা হচ্ছে।

'দ্য এলিনিকন': ইউরোপের স্বপ্ননগরী

এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। মাটি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত বলে ছাড়পত্র পেলেই 'দ্য এলিনিকন'-এর নির্মাণকাজ পূর্ণ গতিতে শুরু হবে। এই মেগা প্রজেক্টের আওতায় তৈরি হচ্ছে:

  • বিশ্বমানের বিলাসবহুল আবাসিক কমপ্লেক্স ও হোটেল
  • বিশাল কমার্শিয়াল হাব (Commercial Hub) বা ব্যবসাকেন্দ্র
  • অত্যাধুনিক স্পোর্টস কমপ্লেক্স
  • ২০০ হেক্টরের একটি বিশাল সবুজ পার্ক (Europe's largest coastal park)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ এবং বিষাক্ত বর্জ্যের ওপর দাঁড়িয়ে এথেন্স এখন এক নতুন এবং আধুনিক ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াচ্ছে। মাটির তলার এই ভয়ানক সত্য আগামী প্রজন্মের জন্য এক নতুন, বিলাসবহুল এবং নিরাপদ জীবনযাত্রার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করল।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. এথেন্সের কোথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাজা বোমা উদ্ধার হয়েছে?

গ্রিসের প্রাক্তন এথেন্স আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (Athens International Airport) মাটির তলা থেকে প্রায় ৩০০টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাজা বা অবিস্ফোরিত বোমা উদ্ধার হয়েছে।

২. ওই এলাকায় বর্তমানে কী প্রজেক্ট চলছে?

সেখানে বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম শহর পুনর্নির্মাণ প্রকল্প 'দ্য এলিনিকন' (The Ellinikon)-এর কাজ চলছে।

৩. বোমা ছাড়াও মাটির তলা থেকে আর কী উদ্ধার হয়েছে?

বোমার পাশাপাশি ওই এলাকা থেকে বিমানবন্দর চলাকালীন জমে থাকা প্রায় ২৭০ টন বিষাক্ত জ্বালানি ও রাসায়নিক বর্জ্য (Asbestos) উদ্ধার করা হয়েছে, যা বর্তমানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শোধন করা হচ্ছে।

Sangbad Ekalavya Digital Desk

প্রতিদিনের ব্রেকিং নিউজ থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি এবং স্থানীয় সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ খবর তুলে আনে সংবাদ একলব্য ডিজিটাল ডেস্ক।

editor@sangbadekalavya.in