গুয়াহাটি: অসমের বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যের সাতটি জেলা জুড়ে এখনও পর্যন্ত ৩ লক্ষেরও বেশি মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮-এ দাঁড়িয়েছে। বন্যার জলে ডুবে গেছে শত শত গ্রাম এবং হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্য সরকার যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ত্রাণ ও উদ্ধার কাজ চালাচ্ছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে ইতিমধ্যেই ৩০টি ট্রাকে করে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত জেলা এবং ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অসমের সাতটি জেলা বন্যার কবলে পড়েছে। এই জেলাগুলি হলো:
- শিবসাগর
- চরাইদেও
- গোলাঘাট
- জোরহাট
- নগাঁও
- বিশ্বনাথ
- কামরূপ মেট্রো
এই জেলাগুলির ২১টি রেভিনিউ সার্কেল এবং ৫৫১টি গ্রাম সম্পূর্ণভাবে জলের তলায়। সরকারি হিসাব মতে, প্রায় ৩,০০,০৩১ জন মানুষ বন্যার ফলে চরম দুর্ভোগের সম্মুখীন হচ্ছেন। শুধু বাড়িঘরই নয়, রাজ্যের কৃষিক্ষেত্রেও বড়সড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার জলে প্রায় ২১,৫২৩.০৮ হেক্টর ফসলি জমি ডুবে গেছে, যা রাজ্যের কৃষি-নির্ভর অর্থনীতির ওপর বিশাল প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি
বন্যায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি বন্যায় ডুবে আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দুজন শিবসাগর জেলায় এবং একজন গোলাঘাট জেলায় প্রাণ হারিয়েছেন। এই নিয়ে চলতি বছর অসমে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৭৮।
গুয়াহাটিতে আরবান ফ্লাড বা শহরকেন্দ্রিক বন্যা
গ্রামীণ এলাকার পাশাপাশি শহর এলাকাতেও বন্যার প্রকোপ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কামরূপ মেট্রো (Kamrup Metro) জেলায় 'আরবান ফ্লাড'-এর (Urban Flooding) কারণে জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে।
কামরূপ মেট্রো জেলার তিনটি রেভিনিউ সার্কেলের বিভিন্ন এলাকা, যেমন- পদুমবাড়ি, বোড়াগাঁও, এক্সেলকেয়ার হাসপাতাল, লাচিত নগর, জু রোড, রুক্মিণীগাঁও, অনিল নগর, নবীন নগর, সাতগাঁও, বেহারবাড়ি, হাতিগাঁও, ওয়্যারলেস, জোড়াবাট এবং জুবিন ক্ষেত্রের কাছে কামারকুচি এলাকা জলমগ্ন। যদিও সরকারিভাবে কামরূপ মেট্রো জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা জানানো হয়নি, তবে জল জমার কারণে যাতায়াত এবং দৈনন্দিন জীবনে চরম ব্যাঘাত ঘটছে।
সরকারি ত্রাণ এবং সহায়তা
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় অসম সরকার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দুর্গতদের সাহায্যে খাবার, পোশাক এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বোঝাই ৩০টি ট্রাক সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলির উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে। অসম সরকারের মন্ত্রীরা এই ত্রাণ বহরের সূচনা করেন। এই কনভয়ে অসম গণ পরিষদ (AGP)-এর সাংসদ, বিধায়ক, দলের প্রবীণ নেতা এবং অসম পুলিশের জওয়ানরাও রয়েছেন।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অসমের মন্ত্রী অতুল বোরা জানান, "আমাদের দলের বেশ কয়েকজন সহকর্মী ঘটনাস্থলে রয়েছেন এবং দুর্গত পরিবারগুলিকে সাহায্য করছেন। হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ১৫,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।"
তিনি আরও জানান, সরকার খাদ্যসামগ্রী, পোশাক এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিতরণ চালিয়ে যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সাহায্য অব্যাহত থাকবে। এর পাশাপাশি ভারতীয় সেনাও (Indian Army) উদ্ধারকাজে হাত মিলিয়েছে। 'অপারেশন জল রাহাত' (Ops Jal Rahat)-এর মাধ্যমে সেনাকর্মীরা বন্যা দুর্গত এলাকা থেকে শিশু ও বয়স্কদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. অসমে বন্যায় কতজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে?
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর অসমে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮-এ দাঁড়িয়েছে।
২. অসমের কয়টি জেলা বর্তমানে বন্যার কবলে পড়েছে?
রাজ্যের মোট সাতটি জেলা বর্তমানে বন্যার কবলে পড়েছে, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে শিবসাগর, চরাইদেও, গোলাঘাট, জোরহাট, নগাঁও, বিশ্বনাথ এবং কামরূপ মেট্রো।
৩. বন্যা দুর্গতদের জন্য রাজ্য সরকার কী সহায়তা দিচ্ছে?
অসম সরকার প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ১৫,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে এবং ৩০টি ট্রাকে করে খাবার ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠিয়েছে।