অমৃতা চন্দ, সংবাদ একলব্য: চৈত্র মাসের শেষ লগ্নে, অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তির ঠিক আগের দিন বাংলার ঘরে ঘরে পালিত হয় এক অত্যন্ত পবিত্র ও ঐতিহ্যবাহী হিন্দু লোকোৎসব— 'নীলষষ্ঠী' বা 'নীলপুজো'। ২০২৬ সালে এই পুণ্যলগ্নটি পড়েছে ১৩ এপ্রিল, সোমবার। বাংলার মায়েদের কাছে এই দিনটির মাহাত্ম্য অপরিসীম। মূলত সন্তানের সুস্থ, দীর্ঘ ও নীরোগ জীবন কামনা করে এবং নিঃসন্তান নারীরা সন্তান লাভের আশায় দেবাদিদেব মহাদেব ও দেবী পার্বতীর (নীল-নীলাবতী) আরাধনা করে এই ব্রত পালন করেন।
পৌরাণিক প্রেক্ষাপট ও বিশ্বাস
লোকবিশ্বাস এবং হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, এই নীলষষ্ঠীর দিনটি হলো নীলকণ্ঠ শিব এবং নীলাবতী (যাঁকে দেবী ষষ্ঠীর রূপ হিসেবেও আরাধনা করা হয়)-এর শুভ বিবাহের দিন। সমুদ্র মন্থনের সময় ওঠা তীব্র হলাহল বা বিষ পান করে শিবের কণ্ঠ নীল হয়ে গিয়েছিল, সেই থেকে তাঁর নাম নীলকণ্ঠ। সেই নীলকণ্ঠের সাথে নীলাবতীর বিয়ের আনন্দোৎসবই হলো নীলপুজো। মনে করা হয়, এই বিশেষ দিনে শিব ও পার্বতীর যুগল উপাসনা করলে সংসারের সমস্ত অমঙ্গল দূর হয় এবং সন্তানের আয়ু বৃদ্ধি পায়।
পুজোর নিয়ম ও আচার
নীলষষ্ঠীর দিন বাংলার মায়েরা সকাল থেকে সারাদিন নির্জলা বা ফল-জল খেয়ে উপবাস করেন। সারাদিন উপবাসের পর গোধূলি লগ্নে বা সন্ধ্যেবেলায় শিবমন্দিরে গিয়ে দেবাদিদেবের পুজো করা হয়। পুণ্যার্থিনী মায়েরা শিবের মাথায় পবিত্র গঙ্গাজল, কাঁচা দুধ, ঘি, মধু এবং তিল ঢেলে স্নান করান। এর সাথে ভক্তিভরে অর্পণ করা হয় মহাদেবের প্রিয় বেলপাতা, আকন্দ ফুল, ধুতুরা এবং বিশেষ করে নীল রঙের অপরাজিতা ফুল।
বাতিদান ও পারণ
সন্ধ্যাবেলা শিবের মাথায় জল ঢালার পর মন্দিরে বা শিবলিঙ্গের সামনে মোমবাতি, মাটির প্রদীপ বা ঘৃতবাতি জ্বালানো হয়। এই বিশেষ প্রথাটি 'নীল বাতি' বা 'বাতিদান' নামে পরিচিত। বিশ্বাস করা হয়, এই আলো সন্তানের জীবনের সমস্ত অন্ধকার ও বাধাবিপত্তি দূর করে। পুজো ও বাতিদানের পর মায়েরা শিবের প্রসাদ গ্রহণ করে এবং বাড়িতে ফিরে ফল, সাবু বা মিষ্টি খেয়ে উপবাস ভঙ্গ করেন। পরের দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তির দিন সাধারণত নিরামিষ আহার গ্রহণ করা হয়।
বাংলার লোকসংস্কৃতিতে নীলপুজো
নীলপুজোর সাথে বাংলার গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির এক গভীর যোগ রয়েছে। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে শিবের গাজন সন্ন্যাসীরা (যাঁদের 'ভক্ত্যা' বলা হয়) গ্রামে গ্রামে ঘুরে শিব-পার্বতীর সঙ সেজে 'নীলের গান' পরিবেশন করেন এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল বা ভিক্ষা সংগ্রহ করেন।
যুগের পরিবর্তন হলেও বাঙালি মায়েদের কাছে নীলষষ্ঠীর আবেগ আজও অমলিন। এই বিশেষ দিনে প্রতিটি মায়ের অন্তরের আকুতি যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ভারতচন্দ্র রায়ের 'অন্নদামঙ্গল' কাব্যের সেই অমর ও অমোঘ প্রার্থনার সাথে— "আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।"
ধর্মীয় উৎসব, বাংলার সংস্কৃতি এবং লেটেস্ট খবরের আপডেট পেতে চোখ রাখুন সংবাদ একলব্য-তে: sangbadekalavya.in
Sangbad Ekalavya Digital Desk
প্রতিদিনের ব্রেকিং নিউজ থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি এবং স্থানীয় সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ খবর তুলে আনে সংবাদ একলব্য ডিজিটাল ডেস্ক। সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সঠিক তথ্যটি দ্রুততম সময়ে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করাই আমাদের এই এডিটোরিয়াল টিমের প্রধান উদ্দেশ্য। সত্য ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাই আমাদের মূলমন্ত্র।
ইমেইল: editor@sangbadekalavya.in
0 মন্তব্যসমূহ