ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা সংঘাত: মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুন কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বিশেষ প্রতিবেদন, সংবাদ একলব্য: ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু, রিয়াধে মার্কিন দূতাবাসে ভয়াবহ ড্রোন হামলা এবং বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন 'হরমুজ প্রণালী' পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা— গত কয়েকদিনে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা আক্ষরিক অর্থেই নজিরবিহীন। একদিকে ইসরায়েল ও আমেরিকা, অন্যদিকে ইরান এবং তার মদতপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি। এই ত্রিমুখী সংঘাতের ভয়াবহতা দেখে বিশ্বজুড়ে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে— আমরা কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের (World War III) দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি?
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সমর বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পরিস্থিতি চরম উদ্বেগজনক হলেও এটিকে এখনই 'তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ' বলা যায় কি না, তা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। আসুন, বর্তমান পরিস্থিতির একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করা যাক।
কেন উঠছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা? (Escalation Factors)
- সরাসরি পরাশক্তির অংশগ্রহণ: এই যুদ্ধে আমেরিকা আর কেবল নেপথ্যে নেই, তারা সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও দূতাবাসে ইরানের হামলা এবং আমেরিকার পাল্টা সামরিক হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে স্থানীয় সংঘাত থেকে আন্তর্জাতিক রূপ দিয়েছে।
- বিশ্ব অর্থনীতিতে পক্ষাঘাত: ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার সিদ্ধান্ত বিশ্বযুদ্ধের একটি বড় অনুঘটক হতে পারে। বিশ্বের ২০% জ্বালানি তেল এই পথ দিয়ে যায়। তেলের সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়লে বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মহামারী দেখা দেবে, যা অনেক দেশকে পরোক্ষভাবে এই যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য করতে পারে।
- জোটের মেরুকরণ: ইসরায়েল ও আমেরিকার পাশে রয়েছে ন্যাটো (NATO) ভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলি। অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক চুক্তিতে না থাকলেও রাশিয়া এবং চীন কৌশলগতভাবে তেহরানের পাশে রয়েছে। এই মেরুকরণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অক্ষশক্তি (Axis) ও মিত্রশক্তির (Allied) সমীকরণের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
কেন এখনই এটিকে 'বিশ্বযুদ্ধ' বলা যাচ্ছে না? (Containment Factors)
- রাশিয়া ও চীনের সরাসরি হস্তক্ষেপের অভাব: একটি যুদ্ধকে 'বিশ্বযুদ্ধ' হতে গেলে বিশ্বের সমস্ত বৃহৎ শক্তিকে সরাসরি রণাঙ্গনে নামতে হয়। রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত এবং চীন তাইওয়ান ইস্যু ও নিজেদের অর্থনীতি নিয়ে সতর্ক। তারা ইরানকে অস্ত্র বা নৈতিক সমর্থন দিলেও, এখনই আমেরিকার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
- পারমাণবিক অস্ত্রের ভয় (Nuclear Deterrence): আমেরিকা, ইসরায়েল (অঘোষিত) এবং রাশিয়ার হাতে থাকা বিপুল পারমাণবিক অস্ত্রই এক অর্থে পূর্ণাঙ্গ বিশ্বযুদ্ধ ঠেকিয়ে রেখেছে। 'পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংস' (Mutually Assured Destruction বা MAD) তত্ত্বের কারণে কোনও দেশই চাইবে না পরিস্থিতি পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে এগোেক।
- সক্রিয় কূটনীতি: ভারত, সৌদি আরব, জর্ডান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো দেশগুলি ক্রমাগত পর্দার আড়ালে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মতো বিশ্বনেতারা সক্রিয়ভাবে উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যুদ্ধের আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত মত কী?
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিটি একটি 'বিশ্বব্যাপী প্রভাবযুক্ত বৃহৎ আঞ্চলিক যুদ্ধ' (Major Regional War with Global Consequences)। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো সেনা মোতায়েন করে সারা বিশ্বজুড়ে লড়াই নয়, বরং এটি একটি 'হাইব্রিড যুদ্ধ'— যেখানে প্রক্সি মিলিশিয়া, সাইবার অ্যাটাক, ড্রোন স্ট্রাইক এবং অর্থনৈতিক অবরোধ (Economic Warfare) প্রধান হাতিয়ার।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আক্ষরিক অর্থে শুরু না হলেও, আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে একটি আঞ্চলিক সংঘাত সারা বিশ্বের মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত প্রভাব ফেলছে। কূটনীতির টেবিলে দ্রুত সমাধান না বেরোলে, এই আগুন যে কোনো মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
পাঠকদের মতামত (Poll)
ইরান, ইসরায়েল এবং আমেরিকার এই সংঘাত কি শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?
Sangbad Ekalavya Digital Desk
প্রতিদিনের ব্রেকিং নিউজ থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি এবং স্থানীয় সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ খবর তুলে আনে সংবাদ একলব্য ডিজিটাল ডেস্ক। সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সঠিক তথ্যটি দ্রুততম সময়ে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করাই আমাদের এই এডিটোরিয়াল টিমের প্রধান উদ্দেশ্য। সত্য ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাই আমাদের মূলমন্ত্র।
ইমেইল: editor@sangbadekalavya.in
0 মন্তব্যসমূহ