রাজ্য বনাম কমিশন সংঘাতে নজিরবিহীন রায় সুপ্রিম কোর্টের, ভোটার তালিকা সংশোধনে এবার নামছেন খোদ বিচারকরা
পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশনের মধ্যে চলমান আস্থার অভাব বা 'ট্রাস্ট ডেফিসিট'-এর জেরে এবার এক ঐতিহাসিক এবং নজিরবিহীন নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর) কাজে রাজ্য সরকারি আধিকারিকদের বদলে এবার সরাসরি বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের নিয়োগ করার নির্দেশ দিল দেশের শীর্ষ আদালত। বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছে যে, দুটি সাংবিধানিক সংস্থার মধ্যে এই চরম অসহযোগিতা এবং ক্রমাগত দোষারোপের পালা চলতে পারে না। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বার্থে ভোটার তালিকা নির্ভুল হওয়া অত্যন্ত জরুরি, আর সেই কারণেই এই অভাবনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে শীর্ষ আদালত।
দীর্ঘ সময় ধরে ভোটার তালিকা সংশোধন ইস্যু নিয়ে রাজ্য সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যে বিবাদ চরমে পৌঁছেছিল। কমিশনের অভিযোগ ছিল, রাজ্যের প্রায় ১.৩৬ কোটি ভোটারের তথ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের তথ্য যাচাই করার জন্য কমিশনের তরফ থেকে রাজ্য সরকারের কাছে পর্যাপ্ত সংখ্যক গ্রুপ-বি অফিসার চাওয়া হলেও, রাজ্য সরকার সহযোগিতা করছে না। অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের পালটা অভিযোগ ছিল যে, নির্বাচন কমিশন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বহু বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই পালটাপালটি অভিযোগের প্রেক্ষিতেই শীর্ষ আদালত হস্তক্ষেপ করে এবং জানায় যে, রাজ্য ও কমিশনের মধ্যে সম্পূর্ণ আস্থার অভাব দেখা দিয়েছে যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য মোটেও সুখকর নয়।
এই অচলাবস্থা কাটাতে এবং একটি স্বচ্ছ ও নির্ভুল ভোটার তালিকা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে একটি বিশেষ অনুরোধ করেছে। আদালতের নির্দেশে বলা হয়েছে, হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি যেন অবিলম্বে বর্তমান বা অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট জজ বা ডিস্ট্রিক্ট জজ পদমর্যাদার বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের এই কাজে 'ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার' (ইআরও) হিসেবে নিয়োগ করেন। এর অর্থ হলো, এবার থেকে খোদ বিচারকরাই সরাসরি ভোটারদের তথ্যের অসঙ্গতি যাচাই এবং তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করবেন। এই গুরুদায়িত্ব পালনে বিচারকদের সরাসরি সহায়তা করবেন জাতীয় নির্বাচন কমিশনের নিযুক্ত মাইক্রো-অবজার্ভাররা।
পাশাপাশি, রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়ায় যুক্ত আধিকারিকদের ওপর হামলা বা অসহযোগিতার যে অভিযোগগুলি উঠছিল, সেই বিষয়টিতেও কড়া নজর দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আধিকারিকদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজ্যের পুলিশের ডিজি-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনে রিপোর্ট তলব করা হয়েছে। আদালতের এই নির্দেশের ফলে আগামী ২৮শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সংশোধিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করার পথ অনেকটাই প্রশস্ত হলো বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। রাজ্যের সরকারি আমলাদের সরিয়ে খোদ বিচারকদের ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো প্রশাসনিক কাজে যুক্ত করার এই রায় দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মাইলফলক হয়ে রইল।

0 মন্তব্যসমূহ
Thank you so much for your kindness and support. Your generosity means the world to me. 😊